প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের, ব্যুরো চীফ নোয়াখালী:
নোয়াখালীর সেনবাগে সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান খোকনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য, ছবি ও মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ায় নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে সেনবাগ থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুর রহিম সরকারকে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। ফলে শাহজাহান খোকনের রাজনৈতিক পরিচয় এবং একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে তার সামাজিক যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
শাহজাহান খোকনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের পদ-পদবিতে ছিলেন না এবং সক্রিয় রাজনীতিও করেননি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সিএন্ডএফ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তার সামাজিক ও পেশাগত যোগাযোগ গড়ে উঠেছে-এমন দাবি তার পক্ষের।
এ প্রসঙ্গে সমর্থন হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান খোকন আওয়ামী লীগের পদ-পদবীযুক্ত ব্যক্তি হতেন, তাহলে বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ও এমপিদের সাথে সখ্যতা ও ঘনিষ্ঠতা থাকার কথা ছিল না।
তবে কোনো রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ছবি তোলা, সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ থাকা-এসব বিষয়কে এককভাবে কোনো ব্যক্তির দলীয় পদ-পদবির প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় কি না, সেটিই এখন আলোচনার অন্যতম বিষয়। এ ধরনের দাবি যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের কমিটি, পদ-পদবির নথি অথবা আনুষ্ঠানিক দলীয় রেকর্ড দেখা প্রয়োজন।
“সেনবাগে নাড়ী, চট্টগ্রামে বাড়ী” নাড়ী টানে বছরে দুই চারবার নোয়াখালীর সেনবাগে আসতে হয় শাহজাহান খোকন। এলাকায় আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র অসহায় মানুষকে সার্বিক সহযোগিতা করে থাকেন তিনি। শাহজাহান খোকনের পারিবারিক পরিচয় নিয়েও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তিনি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ৫ নম্বর অর্জুনতলা ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এবং তার বাবা পুলিশ বাহিনীর সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এসব তথ্যের সরকারি নথিভিত্তিক যাচাই হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
অন্যদিকে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর শাহজাহান খোকনের আমন্ত্রণে ওসি আবদুর রহিম সরকার একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ সেপ্টেম্বর ওসি আবদুর রহিম সরকারকে নোয়াখালী জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) আহমেদ পেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, একজনের বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত খাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে তদন্তের জন্য বলা হয়েছে।
তবে একই সময়ে আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাবিলপুর ইউনিয়নের বটতলা বাজার এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিলের ঘটনায় ওসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। অর্থাৎ ওসি প্রত্যাহারের ঘটনাকে ঘিরে প্রকাশিত সংবাদে একাধিক প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি বা পোস্টের ওপর ভিত্তি করে কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দলের পদধারী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে দলীয় নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। একইভাবে একজন পুলিশ কর্মকর্তা কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত বা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন-এ তথ্য থাকলেও এর সঙ্গে কোনো অনৈতিক সম্পর্ক বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সেটি তদন্তের বিষয়।
সেনবাগের সচেতন মহলের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যের পরিবর্তে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, পুলিশ বিভাগের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রয়োজনীয় নথি প্রকাশ্যে আসা দরকার। কারণ, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক মন্তব্য করা হলে প্রকৃত ঘটনা আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখন একটাই-মো. শাহজাহান খোকনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির ছবি ও সামাজিক যোগাযোগ কি তার রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রমাণ, নাকি দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ও সামাজিক সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ? আর ওসি আবদুর রহিম সরকারকে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার ঘটনায় দাওয়াতে অংশগ্রহণের বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ-তা কি তদন্তেই স্পষ্ট হবে?
ঘটনার প্রকৃত সত্য জানতে এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সেনবাগবাসী।
Leave a Reply