গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার হেলেঞ্চা-টু-বাটি সড়কের পাশে থাকা সরকারি গাছ কেটে একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে বোনারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য একরাম হোসেনের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, কেটে ফেলা গাছগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় দুই লাখ টাকা। তবে অভিযোগের সঙ্গে নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন—যদি সরকারি গাছ কেটে সরকারি প্রয়োজনে কাঠের সাঁকো নির্মাণ করা হয়ে থাকে, তাহলে ওই কাজের জন্য উপজেলা পর্যায়ে প্রায় দুই লাখ টাকার বিল চাওয়া হলো কেন?
স্থানীয়দের অভিযোগ, হেলেঞ্চা-টু-বাটি সড়কের পাশে সরকারি জায়গায় থাকা চারটি গাছ সম্প্রতি কেটে ফেলা হয়। পরে গাছগুলো সরিয়ে নিয়ে জলাবদ্ধ এলাকায় একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের পাশাপাশি নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীরা জানান, সরকারি জায়গায় থাকা গাছ কাটতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা। কিন্তু কোনো অনুমোদন বা নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া গাছগুলো কাটা হয়ে থাকলে সেটি সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম।
এদিকে বিষয়টি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে গাছের মূল্য নিয়ে। চারটি গাছের মূল্য প্রায় দুই লাখ টাকা। একই সঙ্গে গাছ কাটার পর সেটিকে সরকারি কাজে ব্যবহারের কথা বলা হয়ে থাকলে, সে ক্ষেত্রে আবার দুই লাখ টাকার বিল চাওয়ার প্রয়োজন কেন হলো—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বিষয়টিকে ব্যঙ্গ করে বলছেন, “কৈ মাছের তেল দিয়ে কৈ মাছ ভাজার মতো”
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, সরকারি সড়কের পাশে থাকা গাছ কাটার অনুমতি কে দিয়েছেন? গাছ কাটার আগে কোনো সরকারি অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না? কাটা গাছগুলো বর্তমানে কোথায় রয়েছে? গাছগুলোর মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে? আর যদি গাছগুলো সরকারি কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই কাজের বিপরীতে পুনরায় প্রায় দুই লাখ টাকার বিল চাওয়ার কারণই বা কী?
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ঘটনাটি শুধু গাছ কাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সরকারি অর্থের ব্যবহার বা বিল সংক্রান্ত বিষয়ও জড়িত। তাই গাছ কাটার অনুমোদন, সাঁকো নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠের উৎস, গাছের মূল্য নির্ধারণ এবং বিল চাওয়ার পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে যাচাই করা প্রয়োজন। গাছ কাটার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন ছিল কি না, ইউএনও বা শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল কি না এবং দুই লাখ টাকার বিল চাওয়ার বিষয়টি কোন কাজের বিপরীতে—তা প্রশাসনিক তদন্তেই পরিষ্কার হতে পারে।
এলাকাবাসী দাবি করেছেন, উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত ঘটনাটি তদন্ত করে। বিশেষ করে গাছ কাটার অনুমোদন, কাঠের সাঁকো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা, সাঁকো নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠের উৎস এবং দুই লাখ টাকার বিলের বিষয়টি যাচাই করা হোক। তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে ইউপি সদস্য এককরাম হোসেন বলেন, “আমার ওয়ার্ডে দীর্ঘ তিন-চার মাস ধরে একটি জায়গায় জলাবদ্ধতা রয়েছে। সেখানে স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় মানুষজন চলাচল করতে পারেন না। ইউএনও মহোদয়ের নির্দেশে সেখানে আমি একটি কাঠের সাকো তৈরি করি। ইউএনও মহোদয় ও শিক্ষা অফিসার এ বিষয়ে বলেছিলেন বলেই আমি কাঠের ব্রিজটি করি। সরকারি রাস্তার গাছ কাটার অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তবে কাজের শেষের দিকে অল্প কিছু কাঠের প্রয়োজন হওয়ায় রাস্তার পাশের ছোট একটি গাছ কেটেছি। বিষয়টি আমি ইউএনও মহোদয়কে জানিয়েছি।”
এ বিষয়ে বোনারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাছিরুল আলম স্বপন বলেন,হেলেঞ্চা-টু-বাটি সড়কে কিছু গাছ রয়েছে।সরকারি গাছ কাটার বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদ অবগত না আমি ঐ এলাকার স্থানীয়দের কাছে শুনেছি।পরে আমি ঘটনা স্থলে গিয়ে গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছি।আমার ইউনিয়ন পরিষদের ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য একরাম হোসেন ৪-৫ টা গাছ কেটেছেন যা আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে জানিয়েছি।এই গাছ কাটার সরকারি কনো চিঠি আমার ইউনিয়ন পরিষদের কনো রেজুলেশন বা অনুমতি নাই।
এদিকে সচেতন মহল বলছেন, সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ভালো হলেও নিয়মকানুন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাদের মতে, সত্যিই যদি জলাবদ্ধ এলাকায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য সাঁকো নির্মাণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হতে পারে; কিন্তু সরকারি গাছ কাটার আগে যথাযথ অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং একই কাজের বিপরীতে সরকারি অর্থের বিল চাওয়া হয়েছে কি না—এ দুটি বিষয় স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা জরুরি।
সচেতন মহল আরও বলছে, চারটি গাছের মূল্য যদি প্রায় দুই লাখ টাকা হয়ে থাকে, তাহলে গাছগুলোর সরকারি মালিকানা, কাটার অনুমোদন, ব্যবহার এবং মূল্যায়নের নথি প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাঁকো নির্মাণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সেই অর্থের উৎস কী এবং দুই লাখ টাকার বিল কোন খাতে চাওয়া হয়েছে—এসব তথ্যও যাচাই করা দরকার। তাদের মতে, তদন্ত ছাড়া কাউকে দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি সরকারি সম্পদ ও অর্থের বিষয়ে ওঠা প্রশ্নও উপেক্ষা করা উচিত নয়।
গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাওয়ার জন্য সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আশরাফুল কবীরের সাথে যোগাযোগ করার জন্য তার অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি ও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
Leave a Reply