বিশেষ প্রতিবেদক;
রাজধানীর মুগদা, মানিকনগর ও মান্ডা এলাকায় মাদক ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। এলাকার অলিগলিতে এখন প্রকাশ্যেই বসছে মাদকের হাট। এসব চক্রের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। মাদক ও জুয়ার স্পট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেমন হামলার শিকার হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ছত্রছায়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মুগদা ও মানিকনগরের প্রায় প্রতিটি অলিগলিতেই এখন মাদক কেনাবেচার মহোৎসব চলছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, প্রধান স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে, মানিকনগর কুমিল্লা পট্টি, পূর্ব মানিকনগর বালুর মাঠ, মানিকনগর বিশ্বরোড ঢাল এবং মানিকনগর বসুন্ধরা এলাকা। মুগদা স্টেডিয়ামের সামনের ও পেছনের গেট, মুগদা মদিনাবাগের ময়লা-ডিপু এবং মুগদা বড় বাজারের আশপাশ। মান্ডা প্রথম গলি (মোশারফ মিয়ার বাড়ির নিচে), মুড়িয়ালী গলি, মান্ডা খালপাড়, গার্মেন্টস গলি এবং দক্ষিণ মুগদা মসজিদ গলি। বিশেষ করে পূর্ব মানিক নগর বালুর মাঠ পাকা রাস্তার পাশে গ্যারেজের আড়ালে ‘লতা’ নামক এক নারী মাদক ব্যবসায়ী ও তার পুরো পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের সিন্ডিকেট পরিচালনা করছে বলে এলাকাবাসী সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানিয়েছেন।
মাদক বিক্রির পাশাপাশি এই এলাকায় ‘চাঁন-জাদু গ্রুপ’ এবং ‘টাইগার ইমন গ্রুপ’-এর মতো বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এই গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদক সেবন ও বিক্রির পাশাপাশি ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নারীদের উত্ত্যক্ত করার মতো অপরাধে জড়িত।
কয়েক মাস আগে মুগদা মদিনাবাগের ময়লা বস্তি এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে মাদক কারবারিদের হামলার শিকার হন মুগদা থানার এসআই রাসেল মিয়া। এ ঘটনায় পুলিশ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে এসে অপরাধীরা আবারও একই পেশায় লিপ্ত হচ্ছে। এছাড়া, ২০২৪ সালের এপ্রিলে মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একটি নিরীহ পরিবারের ওপর হামলা চালায়। এদের ভয়ে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
ভয়ংকর মাদকের পাশাপাশি মুগদা-মান্ডা-মানিকনগর এলাকায় প্রায় দুই ডজন জুয়ার স্পট রয়েছে। প্রতিদিন এখানে লাখ লাখ টাকার জুয়ার আসর বসে, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে জুয়াড়িরা এসে ভিড় জমায়। এই জুয়া ও মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এলাকার উঠতি যুবসমাজ ছিনতাই ও ডাকাতির মতো বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। প্রায় প্রতি রাতেই এসব স্পটকে কেন্দ্র করে মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বিশাল মাদক ও জুয়া সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মী। এছাড়া, মাদক চক্রগুলো কিছু অনলাইন পোর্টালের ‘কথিত’ সাংবাদিকদের নিয়মিত মাসোহারা বা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে থাকে। এমনকি মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা সরাসরি স্বীকার করে বলে, আমরা সাংবাদিকদের টাকা দিই, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোক সরবরাহ করি। তাই আমাদের ব্যবসা কেউ বন্ধ করতে পারবে না।”
ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য এবং সড়ক পরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব এলাকায় মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে আয়োজিত এক গণমিছিলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, মাদকসেবন ও মাদক কারবারির মাধ্যমে সমাজ ধ্বংসকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। আজ হোক বা কাল, আইন ও বিচারের আওতায় তাদের আসতেই হবে; রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য কোনো প্রভাব তাদের রক্ষা করতে পারবে না। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক সংগঠন ও যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। আপনাদের পাশে আমি এবং পুলিশ প্রশাসন সবসময় আছি।”
অন্যদিকে, ‘যুব-শক্তি সামাজিক আন্দোলন’ সংগঠনের চেয়ারম্যান মো. রাসেল সরকার দেশের সামগ্রিক মাদক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গোটা দেশজুড়ে মাদক আজ এক ভয়ঙ্কর থাবা বিস্তার করেছে। মানিকনগর বিশ্বরোড থেকে শুরু করে বালুর মাঠ পর্যন্ত শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। পুলিশ এদের ধরলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বের হয়ে তারা আবার একই কারবার শুরু করে। টেকনাফ ও মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে দেশে আসা ইয়াবাসহ বিভিন্ন মরণনেশা আজ আমাদের পুরো একটা প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই বিষাক্ত ছোবল থেকে সন্তানদের বাঁচাতে প্রতিটি এলাকায় এখনই জোরালো সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।”
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু পারিবারিক ও সামাজিক কারণ দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে, বন্ধুবান্ধবের নেতিবাচক চাপ ও একাকিত্ব। পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ বা অভিভাবকের দায়িত্বহীনতা। হতাশা, বিষণ্ণতা এবং সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার প্রবণতা। পিতা-মাতার অতিরিক্ত শাসন কিংবা অন্ধ প্রশ্রয়। মাদকের এই করাল গ্রাস থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অভিযানের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারে সচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিৎ।
(মুগদা-মানিকনগরের মাদক ও জুয়া সিন্ডিকেটের নেপথ্যের কুশীলবদের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে থাকছে আগামী পর্ব…)
Leave a Reply