ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাটঃ
বাগেরহাটের চিতলমারীতে মোবাইলের আলোয় সিজারের সময় প্রসূতির জরায়ু ও মূত্রথলি কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন।
মঙ্গলবার দুপুরে বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলা পরিষদ চত্বরে ভুক্তভোগী প্রসূতি লাভলী ঘরামী, তার স্বামী-সন্তান এবং কয়েকশ স্থানীয় নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে এক তীব্র প্রতিবাদী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মূলত হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুল চিকিৎসায় একজন প্রসূতির জীবন সংকটাপন্ন করে তোলার প্রতিবাদেই এই কর্মসূচি পালিত হয়। ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল যখন লাভলী ঘরামীকে সিজারের জন্য ওই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় এবং পূর্বের প্রতিশ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বদলে অপেশাদার ব্যক্তিরা অস্ত্রোপচার পরিচালনা করেন। অস্ত্রোপচার চলাকালীন আকস্মিক বিদ্যুৎ চলে গেলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের চরম দায়িত্বেহীনতা ও পেশাগত অবহেলার কারণে মোবাইলের ফ্ল্যাশব্লাড বা আলো জ্বেলে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচার চালানো হয়। এই নজিরবিহীন ও বর্বরোচিত চিকিৎসাসেবার নামে চলা নৈরাজ্যের ফলস্বরূপ প্রসূতির জরায়ু ও মূত্রথলি গুরুতরভাবে কেটে ফেলা হয়, যা পরবর্তীতে তার শরীরে অপূরণীয় শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তাকে চরম মানবেতর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়।
ভুক্তভোগী প্রসূতি লাভলী ঘরামীর সরাসরি বয়ান অনুযায়ী, খুলনা থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এনে অপারেশন করার চুক্তি থাকলেও অপারেশন থিয়েটারে কোনো রেজিস্টার্ড চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। স্যাকমো অমিত মন্ডল, ক্লিনিক পরিচালক সাব্বির আহম্মেদ রুপম ও রফিকুল ইসলাম নিজেরাই চিকিৎসক সেজে এই জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন এবং দীর্ঘ তিন ঘণ্টার ওই যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়ায় তার জীবনকে বিপন্ন করে তোলেন। ভুল চিকিৎসার এই করুণ পরিণতি ভোগ করতে গিয়ে লাভলী ঘরামী জানান যে ঘটনার ৪৫ দিন পরেও তিনি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি এবং শারীরিক এই জটিলতা কাটাতে তাকে এখন প্রায় দেড় লাখ টাকার প্রয়োজন মেটাতে হবে। এদিকে, এই চাঞ্চল্যকর অপরাধের বিচার চাইতে গিয়েও ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের রোষানলে পড়েন। মানববন্ধনের প্রাক্কালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অভিযুক্ত ক্লিনিক পরিচালকের ভাই নিজেকে যুবদল নেতা পরিচয় দিয়ে কেবল মানববন্ধনে বাধাই দেননি, বরং পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীদেরও প্রকাশ্যেই হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধীদের দম্ভ ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতিরই এক ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক সাব্বির আহম্মেদ রুপম তাদের বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন যে স্যাকমো অমিত মন্ডল ওই অপারেশন করেননি, বরং তা সম্পন্ন করেছিলেন ডা. নাসির উদ্দিন। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিপক্ষ ক্লিনিক মালিকদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে তিনি সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে অপারেশন পরিচালনাকারী ডা. নাসির উদ্দিন দাবি করেছেন যে জটিল অপারেশনটি সফলভাবে শেষ হওয়ার পর রোগী সুস্থ অবস্থাতেই বাড়ি ফিরেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ না মানার কারণেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে নিজের দায় এড়াতে না পেরে ডা. নাসির উদ্দিন স্বীকার করেছেন যে তিনি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছেন এবং রোগীর চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় তিনি ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বহন করবেন। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং দায় সারার এমন জোড়াতালির চেষ্টা প্রমাণ করে যে মফস্বল অঞ্চলের অনুমোদনহীন বা নামসর্বস্ব ক্লিনিকগুলো কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে এবং পরবর্তীতে আর্থিক সমঝোতা বা ক্ষমতার প্রভাবে পার পেয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
এই পৈশাচিক ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসাসেবার ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার নিশ্চিত করেছেন যে ইতিমধ্যে এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ হাতে পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। একই সাথে জানা যায় যে এই একই ক্লিনিক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এর আগেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পরিদর্শন করা হয়েছিল এবং বর্তমানে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। মফস্বল এলাকার আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা এ ধরনের অনিবন্ধিত ও অব্যবস্থাপনাপূর্ণ ক্লিনিকগুলোতে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ছে এবং চিকিৎসকদের খামখেয়ালিপনা ও ভূয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্যে প্রসূতি মৃত্যুর হার ও পঙ্গুত্বের শিকার হওয়ার ঘটনা বেড়েই চলেছে। তাই এই নির্দিষ্ট ঘটনার একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমগ্র স্বাস্থ্য খাতের লাইসেন্সিং পদ্ধতি এবং মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও কঠোর না করলে এ ধরনের অপরাধমূলক অবহেলা রোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
Leave a Reply