ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট
বাগেরহাটের মোংলায় গত তিন মাসে ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে, যেখানে ডেঙ্গুতে দুইজনের মৃত্যুসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪৩৩ জন।
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় গত তিন মাসে ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের ব্যবধানে উপজেলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ২৭৪ জন এবং হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১৫৯ জন, যার সম্মিলিত সংখ্যা ৪৩৩ জন। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ইতোমধ্যে দুইজন রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন, যা স্থানীয় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫ জন ডেঙ্গু রোগী এবং ৫ জন হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মূলত বর্ষা পরবর্তী সময়ে মশার উপদ্রব বৃদ্ধি এবং টিকা কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গু ও হামের এই দ্বিমুখী প্রকোপ দেখা দিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু এবং কম বয়সী ব্যক্তিদের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি হওয়ায় অভিভাবকরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, জনবহুল এলাকাগুলোতে মশা নিধনের নিয়মিত কার্যক্রম নেই বললেই চলে এবং স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রচারণার অভাবে সাধারণ মানুষ শুরুতেই সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হওয়া রোগীদের স্বজনরা জানান, প্রাথমিক অবস্থায় জ্বর বা হামের উপসর্গ দেখা দিলেও অনেকে একে সাধারণ রোগ মনে করে অবহেলা করছেন, যা পরবর্তীতে জটিল আকার ধারণ করছে। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা সীমিত হওয়ায় এবং রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় অনেককেই মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, মশা নিধনে কার্যকর ওষুধের প্রয়োগ এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত না করলে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়া এবং ডেঙ্গুর ভয়াবহতা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এক প্রকার ভীতির সঞ্চার করেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীন জানিয়েছেন, ডেঙ্গু ও হামের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। তবে কেবল হাসপাতালের সেবাই যথেষ্ট নয়, বরং ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঠ পর্যায়ে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল সতর্কবার্তা দিয়ে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, বরং মশা নিধনে নিয়মিত স্প্রে কার্যক্রম এবং শিশুদের হামের টিকার আওতা আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান প্রয়োজন।
মোংলায় ডেঙ্গু ও হামের এই যুগপৎ প্রাদুর্ভাব কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং এটি স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর একটি বড় পরীক্ষা। সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই সংক্রমণ আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে, যা স্থানীয় জনজীবনকে স্থবির করে দেবে। দ্রুত মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার এবং আক্রান্ত রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে কোনো প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং স্বাস্থ্যসেবার মান বজায় থাকে।
Leave a Reply