নিষেধের পাহারা
স -মাধুরী ব্যানার্জী
বাড়ির পুরোনো দোতলার ঘরটায় যাওয়া ছিল কঠোরভাবে নিষেধ।
দিদা প্রায়ই বলতেন,
— “ও ঘরে কেউ যাবে না। ওখানে পুরোনো জিনিসপত্র আছে, বিপদ হতে পারে।”
বারো বছরের অয়ন নিষেধটা যত শুনত, কৌতূহল তত বাড়ত। বিশেষ করে ঘরের দরজায় ঝোলানো মরচে-পড়া তালাটা তার মনে হাজার প্রশ্ন জাগাত।
এক বর্ষার বিকেলে বিদ্যুৎ চলে গেল। সবাই যখন নিচের ঘরে ব্যস্ত, অয়ন চুপিচুপি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। আশ্চর্য! দরজার তালাটা খোলা।
ঘরের ভেতরে ধুলো, পুরোনো আসবাব আর কাঠের বাক্সের স্তূপ। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি ছোট্ট লোহার সিন্দুক। সিন্দুকের ওপর লেখা—
“খুলবে না।”
অয়নের হাত থেমে গেল।
মুহূর্তের জন্য সে ভাবল, “নিষেধ মানে কি সত্যিই বিপদ?”
কিন্তু কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে গেল। ঢাকনা তুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কিছু পুরোনো চিঠি, একটি সাদা-কালো ছবি আর একটি কাপড়ে মোড়া ডায়েরি।
ঠিক তখনই পিছন থেকে দিদার কণ্ঠ—
— “অয়ন!”
অয়ন ভয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
দিদা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ছবিটা হাতে নিলেন। তাঁর চোখে জল।
— “এটা তোমার দাদুর ডায়েরি। স্বাধীনতার সময় তিনি এই বাড়িতে অনেক বিপদগ্রস্ত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। কারও হাতে পড়লে তাঁদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যেতে পারত। তাই এই ঘরটা ছিল গোপন আশ্রয়।”
অয়ন অবাক হয়ে বলল,
— “তাহলে এত বছর ধরে ঘরটা বন্ধ কেন?”
দিদা মৃদু হেসে বললেন,
— “কিছু নিষেধ ভয়ের জন্য নয়, স্মৃতি আর দায়িত্ব রক্ষা করার জন্য।”
অয়ন মাথা নিচু করল।
সেদিন সে বুঝেছিল—সব নিষেধ অমান্য করার জন্য নয়; কিছু নিষেধের পেছনে থাকে অদৃশ্য এক পাহারা।
তারপর থেকে বাড়িতে যখনই কোনো নিয়ম শুনত, অয়ন প্রথমে প্রশ্ন করত—
“কেন?”
আর উত্তরটা বুঝে তবেই সিদ্ধান্ত নিত, নিষেধটা মানা দরকার, নাকি বদলানো দরকার।
Leave a Reply