অস্তিত্বের দ্যোতনা
-মাধুরী ব্যানার্জী
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি মাটিতে নামেনি। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় বসে পুরোনো খাতার পাতায় কিছু লিখছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু। তাঁর হাতে কাঁপুনি এসেছে, চোখেও ঝাপসা দেখে। তবু প্রতিদিন তিনি লিখতেন—কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যতদিন নিজের ভেতরের কথাগুলো লিখে যেতে পারে, ততদিন তার অস্তিত্ব নিভে যায় না।
গ্রামের মানুষ তাঁকে এখন আর তেমন মনে রাখে না। নতুন স্কুল হয়েছে, নতুন শিক্ষক এসেছে, নতুন প্রজন্ম মোবাইলের পর্দায় পৃথিবী দেখে। অনিরুদ্ধবাবুর পড়ানো ছাত্রদের অনেকেই বড় চাকরিতে গেছে, কেউ বিদেশে, কেউ শহরে। মাঝে মাঝে কেউ এলে প্রণাম করে, কিন্তু বেশিরভাগই ব্যস্ততার অজুহাতে চলে যায়।
একদিন স্কুলে এল সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী—চামেলী। সে বাংলা রচনা প্রতিযোগিতার জন্য সাহায্য চাইতে এসেছিল।
—“দাদু, ‘মানুষ কেন বেঁচে থাকে’—এই বিষয়ে লিখতে হবে। আপনি বলবেন?”
অনিরুদ্ধবাবু মৃদু হেসে বললেন, —“মানুষ শুধু শ্বাস নিতে বাঁচে না। মানুষ বেঁচে থাকে অন্যের জীবনে নিজের আলো রেখে যেতে।”
চামেলী বিস্মিত হয়ে শুনল। তারপর জিজ্ঞেস করল, —“তাহলে আপনার আলো কোথায়?”
প্রশ্নটি যেন বৃদ্ধের বুকের গভীরে ঢেউ তুলল।
তিনি ধীরে ধীরে একটি কাঠের বাক্স খুললেন। সেখানে শত শত চিঠি। পুরোনো ছাত্রদের লেখা—“স্যার, আপনার জন্য আজ আমি ডাক্তার”, “আপনার শেখানো সততা আজও ভুলিনি”, “আপনি না থাকলে আমি হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিতাম…”
চামেলী একের পর এক চিঠি পড়তে পড়তে বুঝল—যে মানুষ নিজের জন্য কিছু রেখে যায়, তার স্মৃতি ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু যে অন্যের ভেতর স্বপ্ন বুনে দেয়, সে অদৃশ্য হয়েও থেকে যায়।
কয়েক মাস পরে অনিরুদ্ধবাবু আর রইলেন না।
তাঁর মৃত্যুর পর গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে দেখল—দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ এসে জড়ো হয়েছে। কেউ চিকিৎসক, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ কৃষিবিদ, কেউ কবি। সবার হাতে একটি করে ফুল, আর চোখে জল।
স্কুলের নতুন ভবনের সামনে তাঁর নামে একটি ছোট্ট পাঠাগার গড়ে উঠল। উদ্বোধনের দিন চামেলী বক্তৃতায় বলল—
“অস্তিত্ব মানে শুধু নিজের নামটুকু টিকিয়ে রাখা নয়। অস্তিত্বের দ্যোতনা তখনই প্রকাশ পায়, যখন একজন মানুষের জীবন অন্য মানুষের পথকে আলোকিত করে।”
সেদিন আকাশে হালকা বাতাস বইছিল। পাঠাগারের জানালায় রাখা অনিরুদ্ধবাবুর ব্যবহৃত পুরোনো কলমটি যেন নিঃশব্দে সাক্ষ্য দিচ্ছিল—মানুষের শরীর একদিন থেমে যায়, কিন্তু তার আদর্শ, শিক্ষা আর ভালোবাসা সময়ের সীমানা পেরিয়ে বেঁচে থাকে।
অস্তিত্বের প্রকৃত দ্যোতনা তাই নামের আড়ম্বর নয়; তা লুকিয়ে থাকে মানুষের স্পর্শে, কর্মে, আর সেইসব হৃদয়ে, যেখানে একজন মানুষ নিঃশব্দে আলো জ্বেলে দিয়ে যায়।
Leave a Reply