প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের, ব্যুরো চীফ নোয়াখালী:
উত্তেজনা, রোমাঞ্চ, স্নায়ুচাপ আর নাটকীয়তার সব রং ছড়িয়ে পর্দা নামল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। সোমবার (২০ জুলাই) বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ঐতিহাসিক মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নেয় স্পেন।
ফাইনাল খেলাটি দেখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা রঙিন পর্দায় চোখ রেখে স্নায়ুযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে প্রচুরসংখ্যক ফুটবলপ্রেমীরা খেলা দেখার জন্য রাত জেগে আনন্দে বিমোহিত ছিল।
শুরু থেকেই দুই দল খেলেছে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও রক্ষণাত্মক ফুটবল। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা এবং স্পেন-উভয় দলই মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষায় ছিল। ফলে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ তৈরি হলেও দুই গোলরক্ষকের দৃঢ়তা এবং রক্ষণভাগের নিখুঁত পারফরম্যান্স ম্যাচকে নিয়ে যায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়েও উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। ম্যাচের ১০৬তম মিনিটে স্পেনের দ্রুতগতির এক আক্রমণ থেকে ডি-বক্সের ভেতরে বল পেয়ে নিখুঁত শটে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন ফেরান তোরেস। সেই গোলেই উল্লাসে ফেটে পড়ে স্প্যানিশ সমর্থকরা। শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ১-০ ব্যবধানের জয় নিয়েই বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে স্পেন।
গোল হজমের পর সমতায় ফেরার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণ চালিয়েও স্পেনের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ ভাঙতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই স্পেনের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং হাজারো সমর্থক আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন।
এই জয়ের মাধ্যমে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেল স্পেন। আধুনিক, গতিময় ও কৌশলনির্ভর ফুটবলের দৃষ্টিনন্দন প্রদর্শনীতে পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে। অন্যদিকে, টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল আর্জেন্টিনার।
এবারের বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের প্রথম ৪৮ দলের বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই আসরে ফুটবল বিশ্ব দেখেছে অসংখ্য চমক, অঘটন, নতুন তারকার উত্থান এবং রুদ্ধশ্বাস লড়াই। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট-প্রতিটি ধাপেই ছিল উত্তেজনা আর নাটকীয়তার ছাপ। ফুটবলের আধুনিক কৌশল, গতি, শৃঙ্খলা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে এই আসর।
শুধু মাঠের লড়াই নয়, ২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল সংস্কৃতি, বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিক সম্প্রীতিরও এক অনন্য মিলনমেলা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এক আবেগে মেতে উঠেছিলেন এই মহাযজ্ঞে। ফুটবল আবারও প্রমাণ করেছে—ভাষা, জাতি ও ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে এটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ঐক্যের ভাষা।
ফাইনালের এই নাটকীয় জয় স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক গৌরবময় অধ্যায় যোগ করল। আর আর্জেন্টিনার জন্য এটি হয়ে থাকবে আক্ষেপের এক রাত। তবে জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত, আবেগ, বিস্ময় এবং অনুপ্রেরণার গল্প।
ফুটবলের এই মহোৎসব শেষ হলেও এর রেশ দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াবে ক্রীড়াপ্রেমীদের হৃদয়ে। নতুন প্রজন্মের জন্য এটি হয়ে থাকবে সাহস, কৌশল, অধ্যবসায় এবং দলগত ঐক্যের এক অনন্য শিক্ষার নাম। জয় হোক ফুটবলের, জয় হোক বিশ্ব ক্রীড়ার।
Leave a Reply