মুক্ত মতপ্রকাশ:
বাংলাদেশের জনগণের মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধার, মানবাধিকার রক্ষা এবং লুণ্ঠিত জাতীয়তাবাদ ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে কেটে গেছে দীর্ঘ দেড় দশক। এই দীর্ঘ সময়ে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের জুলুম, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, কারাদণ্ড, গুম ও খুনের বিরুদ্ধে রাজপথে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে এ দেশের অধিকারকামী মানুষ। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, বিএনপি-জামাত-শিবির পন্থী সাংবাদিক সহ জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে পুলিশি নির্যাতন ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন উপেক্ষা করে ঐক্যবদ্ধভাবে এই আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
আন্দোলনের এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২৪শে জুলাই দেশের ছাত্র-জনতা এক ঐতিহাসিক গণবিস্ফোরণের মাধ্যমে এই সংগ্রামে সরাসরি শরিক হয়। তাদের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অবশেষে আমরা পেয়েছি ফ্যাসিবাদমুক্ত একটি স্বাধীন, নতুন বাংলাদেশ। মূলত ২৪শে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ সেদিন রাস্তায় নেমেছিল বলেই স্বৈরাচারের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্র-জনতার নতুন রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি’ (এনসিপি) হয়তো ক্ষমতার সমীকরণে কিংবা কৌশলগত কারণে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশকের রক্তস্নাত ইতিহাস প্রমাণ করে, তারা কেবল কোনো সাধারণ ‘বিরোধী দল’ নয়; বরং তারা আমাদের ১৭ বছরের পরীক্ষিত সহযোদ্ধা। ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্মম নির্যাতনের শিকার যুবদল ও ছাত্রদল যেমন হয়েছে, ঠিক তেমনি সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি জুলুমের শিকার হয়েছে জামাত-শিবির ও অন্যান্য অধিকারকামী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। একই অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, একই রাজপথের ধুলো আর একই কান্নার জল আমাদের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধেছে।
বিগত ১৭ বছর ধরে চোখের সামনে যুবদল, ছাত্রদল আর জামাত-শিবিরের ছেলেদের একসঙ্গে মার খেতে দেখেছি, একসঙ্গে জেল খাটতে দেখেছি। আজ রাজনীতিতে যে যার মতো দল করতেই পারে, কিন্তু স্বৈরাচার তাড়াতে তারা যে একসঙ্গে রক্ত দিয়েছে—সেটা তো আর মিথ্যা হয়ে যায় না। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং নতুন করে যেন কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম না হয়, সেজন্য এই দলগুলোর মধ্যে অন্তত দেশপ্রেমের প্রশ্নে ঐক্য থাকাটা আজ বড্ড প্রয়োজন।
তাই আদর্শিক বা কৌশলগত কারণে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক হলেও, অতীতের সেই দীর্ঘ ত্যাগের ইতিহাসকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এখন যারা ক্ষমতার বিরোধী পক্ষে আছেন, তাদেরকে শত্রু মনে না করে সহযোদ্ধা ভাবার এই মানসিকতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য সত্যিই ইতিবাচক।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ভিন্নমত বা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবেই। তবে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণআকাঙ্ক্ষাকে রক্ষা করতে হলে কিছু মৌলিক বিষয়ে কোনো আপস করা চলবে না। বিশেষ করে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট শক্তির অবশিষ্টাংশ, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ এবং দেশবিরোধী যেকোনো বারুদপন্থী বা উগ্রবাদী মহলের ষড়যন্ত্র রুখে দিতে আমাদের জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে হবে। ফ্যাসিবাদের দোসররা যাতে আর কখনো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য সব গণতান্ত্রিক শক্তির এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ধরে রাখা উচিত। রাজপথের এই ভ্রাতৃত্ববোধই হোক আগামী দিনের বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল শক্তি।
লেখক:
মোঃ রাসেল সরকার
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
চেয়ারম্যান, যুব-শক্তি সামাজিক আন্দোলন।
ঢাকা, ১৮ জুলাই, ২০২৬ ইং
Leave a Reply