মত প্রকাশ-মোঃ রাসেল সরকার:
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, জনগণের গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ২৭ অক্টোবর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী যুবদল প্রতিষ্ঠা করেন। উৎপাদনমুখী রাজনীতির মাধ্যমে যুবশক্তিকে কর্মশক্তিতে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য নিয়ে পথ চলা এই সংগঠনটির প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন আবুল কাশেম (পরবর্তী সময়ে সভাপতি) এবং প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাইফুর রহমান। বিভিন্ন সময়ে মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বরকতউল্লাহ বুলু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাইফুল আলম নীরব ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর মতো নেতারা যুবদলের হাল ধরেছেন। বর্তমানে সংগঠনটির নেতৃত্বে রয়েছেন সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না এবং সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন।
কিন্তু আজ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদের পতনের পর যুবদলের তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীদের মনে এক চরম হতাশা ও বুকভরা ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে— “এই জন্যই কি দীর্ঘ দেড় দশক সরাসরি রাজপথে ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলাম?” এই আকুল প্রশ্নটি আজ শুধু পল্টন থানা ১৩নং ওয়ার্ড যুবদলের তৎকালীন সভাপতি পদপ্রার্থী মো: আব্দুল আলিমের একার নয়; বরং দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও পদ-বাণিজ্যের শিকার হওয়া হাজারো লড়াকু সৈনিকের। গত ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে যারা ঘরে বসে আরাম-আয়েশ করেছেন, স্বৈরাচারের পতনের পর রাতারাতি তারাই আজ বিএনপির ‘ত্যাগী নেতা’ সেজে পদের সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছেন। অথচ যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছেন, তারা আজ চরম অবমূল্যায়নের শিকার।
সেই দিন দেখেছি, স্বৈরাচারী আমলে রাজপথে আব্দুল আলিমের ভূমিকা ছিল অনন্য। ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বরের বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশের পূর্বে, ৬ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে পার্টি অফিসের সামনে অবস্থানকালে ডিবি ও পুলিশ বাহিনী যুবদল নেতা লিওন হক লিওনকে গ্রেপ্তার করে। সে সময় আব্দুল আলিম তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে পুলিশের অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন— “এখান থেকে একজনকেও নিতে দেবো না।” সেদিন রাজপথের কর্মীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং কর্মীরা লিওন হক লিওনকে ছিনিয়ে মুক্ত করে আনেন। ফ্যাসিবাদের সেই চরম দুঃসময়ে পুলিশের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে একজন সহযোদ্ধাকে মুক্ত করা সাধারণ কোনো বিষয় ছিল না।
শুধু তাই নয়, ২০১৮ সালে খিলগাঁও গোড়ানে আফরোজা আব্বাসের নির্বাচনী প্রচারণায় ফ্যাসিবাদী সংগঠন আওয়ামী লীগের হামলায় নিজেকে ঢাল হিসেবে বিলিয়ে দিয়ে রক্তাক্ত হয়েছিলেন যুবদল নেতা আলিম। পরবর্তীতে আফরোজা আব্বাস মামলা করতে গেলে যখন ভয়ে কেউ সাক্ষী হতে চায়নি, তখন যুবদল নেতা আব্দুল আলিম ১ নম্বর সাক্ষী হন। এর জেরে ওই নির্বাচনের দিন রাতে তার গ্রামের বাড়িতে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশে হামলার পর যখন মাঠ শূন্য ছিলো তৎকালীনও এই যুবদল নেতার ভূমিকা ছিল অন্যরকম। ২০২৪ সালের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক দৈনিক বাংলা মোড় থেকে নিজের জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ, র্যাব ও ডিবির সামনে ফ্যাসিস্ট হাসিনার অবৈধ নির্বাচনের বিরুদ্ধে’ ব্যাগ হাতে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়েছিলেন এই আলিম। এর পর থেকে তার ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়। পুলিশের হাত থেকে রেহাই পায়নি তার ৪ বছরের সন্তান ও প্রতিবন্ধী ছোট বোনও। পরিবারের সবাইকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে তাকে। সর্বশেষ, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনেও পল্টন মোড়ে সম্মুখভাগে নেতৃত্ব দেন আলিম। তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে নির্যাতন চালায়।
পল্টন থানা যুবদলের একাধিক সক্রিয় নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিগত দিনে কমিটিতে পদ না থাকাটা আব্দুল আলিমদের অযোগ্যতা ছিল না, বরং তা ছিল তৎকালীন কিছু নেতার ব্যর্থতা ও ‘কমিটি বাণিজ্য’। আজ অনেকে অজুহাত দেখান যে যুবদল নেতা আলিম নাকি ‘অ্যাক্টিভ’ ছিলেন না! তাহলে আমি বলবো, ডিজিটাল পাল্লা দিয়ে মেপে দেখা হোক— বিগত দিনে কমিটিতে পদ নিয়ে কার কী ভূমিকা ছিল, আর পদ ছাড়া আব্দুল আলিমের রাজপথে কী ভূমিকা ছিল? তৎকালীন ১৮২ জনের কমিটির মধ্যে আর কার বাড়ি স্বৈরাচারী ক্যাডাররা পুড়িয়েছিল? একটিও নজির নেই।”
সাবেক পদের অহংকার দেখানো নেতাদের উদ্দেশ্যে আব্দুল আলিম নিজেই উল্টো প্রশ্ন ছোঁড়েন, “তোমাদের পদ থাকা সত্ত্বেও দলের জন্য রাজপথে ভূমিকা কতটুকু ছিল?” তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও আপোসহীন দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া এবং দেশনায়ক তারেক রহমানের একজন আদর্শিক কর্মী। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি কোনো দিন পা-চাটা বা দালালি রাজনীতি করি না, আমি রাজপথের রাজনীতি করি।”
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেকোনো আদর্শিক রাজনৈতিক দলের প্রধান শক্তি হলো তার তৃণমূলের নিঃস্বার্থ কর্মীবাহিনী। যুবদল বা বিএনপির মতো ঐতিহ্যবাহী দল যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে, তখন যদি চাটুকার ও সুবিধাবাদীদের ভিড়ে আব্দুল আলিমের মতো পরীক্ষিত ও নির্যাতিত কর্মীরা হারিয়ে যান, তবে তা দলের দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে।
সাংবাদিক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাসিবাদের পতনের পর এখন দলে ‘সিস্টেম লস’ ও পদ-বাণিজ্য কঠোর হস্তে বন্ধ করা প্রয়োজন। যারা বুক দিয়ে পার্টি অফিস পাহারা দিয়েছেন, স্বৈরাচারের বুলেট ও ডিবির নির্যাতন সয়েছেন, তাদের কোণঠাসা করে রাখলে নতুন প্রজন্মের কর্মীরা রাজনীতিতে ত্যাগ স্বীকারের প্রেরণা হারিয়ে ফেলবে।
আমি একটা কথাই বলবো, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া জাতীয়তাবাদী যুবদল কোনো তেলবাজ বা সুবিধাভোগীদের সংগঠন নয়। এটি রাজপথ থেকে উঠে আসা সাহসী জনমানুষের ভ্যানগার্ড। বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের স্বপ্নের ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়তে হলে দল থেকে চাটুকার ও বসন্তের কোকিলদের ছাঁটাই করতে হবে। পদ-বাণিজ্যের সিন্ডিকেট ভেঙে রাজপথের পরীক্ষিত, নির্যাতিত ও ত্যাগী কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করাই হবে শহীদ জিয়ার প্রকৃত আদর্শের আসল প্রতিফলন।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ
যুব, ঐক্য, প্রগতি
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
লেখক:
মোঃ রাসেল সরকার,
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী; সভাপতি, যুব-শক্তি সামাজিক আন্দোলন
ঢাকা; রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬ ইং।
Leave a Reply