1. lifemedia766@gmail.com : admin : Badsah Deoan
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৫০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
টেকনাফে এপিবিএনের অভিযানে ডাকাত সাদ্দাম গ্রুপের সদস্য আটক পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, উপজেলায় প্রথম ছিলোনিয়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় মফস্বলের প্রতিকূলতা পেরিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করলো উম্মে মেহবুবা সফল নারী উদ্যোক্তা ও জনশক্তি রপ্তানিকারক মায়া বেগম পেলেন ‘দৈনিক আমার সংগ্রাম সম্মাননা-২০২৫’ বই পড়ি, দেশ গড়ি’,‘সেরা পাঠকের খোঁজে’কর্মসূচির উদ্বোধন ও আলোচনা সভা! পানছড়ির দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওয়াদুদ ভূইয়ার উদ্যোগে ৯০ জোড়া বেঞ্চসহ আসবাবপত্র বিতরণ জেলায় শ্রেষ্ঠ টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম টেকনাফে যুবক-যুবতীদের জীবিকা ও জীবনমান উন্নয়নে আলোচনা সভা অনুষ্টিত মাদকবিরোধী অভিযান,১০ বোতল এসকাফ সিরাপ ও সিএনজিসহ নবীনগরের তিনজন গ্রেপ্তার! চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক দলের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা আদালতে ভাঙচুর ও বিচারকের ওপর হামলার প্রতিবাদ, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এমপি নূরুল ইসলাম বুলবুল

মধুরতম ভাষার মুকুট থেকে ধ্রুপদী সিংহাসন: বাংলার লড়াই ও আগামীর পথ

  • প্রকাশকাল: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

লুতুব আলি

ভাষা যখন মায়ের মতো আগলে রাখে, তখন তার নাম হয় বাংলা। বিশ্বের দরবারে এই বাংলাকেই বারবার বলা হয়েছে ‘মধুরতম ভাষা’। লোকমুখে প্রচলিত, ইউনেস্কোর এক সমীক্ষায় বাংলা ভাষার ধ্বনিমাধুর্য, উচ্চারণের কোমলতা আর কাব্যিক ব্যঞ্জনার কারণে তাকে ‘Sweetest Language of the World’ বলা হয়েছে। সরকারি নথিতে সিলমোহর খুঁজতে গিয়ে অনেকে হোঁচট খান। কিন্তু কোটি বাঙালির কান জানে, একুশের মিছিল জানে, রবীন্দ্রনাথের গান জানে – বাংলা মিষ্টি। এই মাধুর্যই বাংলার প্রথম আন্তর্জাতিক পরিচয়।

কেন বাংলা মধুর? উত্তরটা ভাষার শরীরে লুকিয়ে। বাংলায় মহাপ্রাণ ধ্বনির আধিক্য, স্বরবর্ণের খোলা উচ্চারণ, যুক্তাক্ষরের সুরেলা প্রবাহ – সব মিলিয়ে কানে বাজে বীণার মতো। ‘মা’, ‘ভালোবাসা’, ‘জল’, ‘আলো’ – শব্দগুলো উচ্চারণ করলেই টের পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন ‘আমার সোনার বাংলা’, তখন সুর আর বাণী এক হয়ে যায়। নজরুল যখন ডাকেন ‘চল চল চল’, তখন দ্রোহও হয়ে ওঠে সঙ্গীত। এই ধ্বনিগত কোমলতাই বাংলাকে বিশ্বের দরবারে আলাদা করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হল, তখন বোঝা গেল মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ইতিহাসও এই মাধুর্যেরই অংশ।

কিন্তু মিষ্টি হলেই কি বাঁচে? ভাষার বয়স লাগে, শিকড় লাগে, রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাগে। এখানেই শুরু ত্রিপুরার লড়াই। বাঙালি জানত চর্যাপদই আদি। তার আগে অন্ধকার। কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা সুনীতি চাটুজ্যের বই আঁকড়ে বললেন, “আর খুঁজে লাভ নেই”। তখনই ঘুম ভাঙল ত্রিপুরা বাংলা আকাদেমির। তাঁরা বসলেন না। পুঁথি ঘাঁটলেন, তাম্রশাসন তুললেন, পাথরের গায়ে কান পাতলেন। প্রমাণ নিয়ে ছুটলেন ILSR-এর অধিকর্তা স্বাতী গুহ আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায়। যৌথ গবেষণা বলল – বাংলা ভাষার বয়স ২৫০০ বছর। চর্যাপদ সাহিত্যের জন্মচিহ্ন, কিন্তু ভাষা হিসেবে বাংলা তার দেড় হাজার বছর আগে থেকেই প্রবাহিত।

এই লড়াইয়ের সামনে থেকে হাল ধরেছিলেন ত্রিপুরা বাংলা আকাদেমির সচিব কৃষ্ণকুসুম পাল। ‘চৌতারা’ কবিতার জনক তিনি। কলমে যেমন দ্রোহ, কাজেও তেমন জেদ। তাঁর নেতৃত্বে আকাদেমি নথি গুছিয়ে ত্রিপুরা সরকার আর পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে এক টেবিলে বসাল। যৌথ আবেদন গেল দিল্লিতে। দীর্ঘ যাচাইয়ের পর কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করল – বাংলা এবার ধ্রুপদী ভাষা। অনুদানের দরজা খুলল, গবেষণার আকাশ মিলল। যে ত্রিপুরাকে সবাই প্রান্তিক ভাবত, সেই ত্রিপুরাই বাংলা ভাষার কপালে রাজটিকা পরিয়ে দিল। ত্রিপুরা জেগেছে বলেই জেগেছে বাংলা।

ধ্রুপদী মুকুট পরা মানে যুদ্ধ শেষ নয়। বরং এবার লড়াই আরও কঠিন। মধুরতম তকমা আর ধ্রুপদী স্বীকৃতি ধরে রাখতে গেলে ঘর থেকে শুরু করতে হবে। আজ ঘরে ঘরে ছেলেমেয়ে ‘মা’ ডাকতে লজ্জা পায়। ইংরেজি মাধ্যমের মোহে বাংলা ব্রাত্য হচ্ছে। চাকরির বাজারের অজুহাতে মাতৃভাষা কোণঠাসা। যে ভাষার জন্য প্রাণ গেছে, যে ভাষার জন্য ত্রিপুরা রাত জেগেছে, সেই ভাষাই নিজের উঠোনে উদ্বাস্তু। এই লজ্জা ভাঙার দায় ত্রিপুরা বাংলা আকাদেমির, কৃষ্ণকুসুম পালের, আর প্রত্যেক বাঙালির।

আগামী দিনে বাংলাকে টিকিয়ে রাখতে পাঁচটা কাজ জরুরি। প্রথম, স্কুলে বাংলা বাধ্যতামূলক করা। শুধু দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নয়, চিন্তার ভাষা হিসেবে। দ্বিতীয়, প্রযুক্তিতে বাংলা। মোবাইলের কিবোর্ড, এআই টুল, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট – সবখানে বাংলা যেন সহজ হয়। তৃতীয়, অনুদানের টাকা দিয়ে হাজার পুঁথি ডিজিটাল করা, অভিধান হালনাগাদ করা, তরুণ গবেষকদের ফেলোশিপ দেওয়া। চতুর্থ, বাজার তৈরি করা। বাংলা বই, বাংলা সিনেমা, বাংলা কনটেন্ট যেন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়। পঞ্চম, আত্মমর্যাদা ফেরানো। ‘আমার পরিচয় – আমি বাঙালি’ এই ঘোষণা যেন ঘরে ঘরে ওঠে।

ত্রিপুরা বাংলা আকাদেমির ‘বাংলা জননী’ ম্যাগাজিন সেই লড়াইয়ের ইস্তাহার। প্রচ্ছদে মঙ্গল শোভাযাত্রার মুখোশ, পটচিত্রের আবহমান বাংলা, আর ছড়িয়ে থাকা অ-আ-ক-খ। এ ছবি বলছে – বাংলা শুধু অতীত নয়, বাংলা উৎসব, বাংলা শিল্প, বাংলা ভবিষ্যৎ। সম্পাদক কৃষ্ণকুসুম পাল জানেন, জননী শুধু জন্ম দেয় না, আগামী হাজার বছরের পথও কেটে দেয়।

মুকুটের ভার আর সিংহাসনের দায় একসাথে কাঁধে নিয়েছে ত্রিপুরা। মধুরতম ধ্বনি আর ধ্রুপদী গরিমা – দুই হাতে দুই মশাল জ্বেলে জননী এখন পথ দেখাচ্ছে। এই আলো নিভতে দেওয়া যাবে না। কারণ ভাষা বাঁচলেই বাঁচবে পরিচয়, আর পরিচয় বাঁচলেই বাঁচবে জাতি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এধরণের অন্যান্য নিউজ