হাকিকুল ইসলাম খোকন,বাপসনিউজঃ হোয়াইট হাউজে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ ঘটনা দেখে অনেকেই বিস্মিত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বন্ধু এবং প্রিয় অতিথি সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে অভূতপূর্ব সম্মাননা জানালেন। তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। এমন সম্মাননা এরবং প্রশংসা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনকালে দেখার কোনো নজির নেই। বিনিময়ে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স আমেরিকায় এক ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগসহ ব্যবসার প্রতিশ্রম্নতি দিয়েছেন। এসোসিয়েটেড প্রেস পরিবেশিত খবরটির বাংলা অনুবাদ বাংলাদেশ থেকে পাওয়া গেছে। এখানে মূল খবরটি মুদ্রিত হলো।
হোয়াইট হাউজে সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। হ্যান্ডশেক আর পিঠ চাপড়ানোর আধিক্যে ভরা এ বৈঠকে ট্রাম্প মানবাধিকারের প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে যুবরাজের রাষ্ট্রনায়কসুলভ আচরণের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি আরবের কয়েক বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা দেন।
সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার ঘটনায় আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমবিএসকে অভিযুক্ত করার মাত্র সাত বছর পর হোয়াইট হাউজে এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজের দক্ষিণ লনে লালগালিচা, গার্ড অব অনার, সামরিক ব্যান্ড এবং ফাইটার জেটের ফ্লাইওভার—সব মিলিয়ে সৌদি যুবরাজের অভ্যর্থনায় ছিল রাজকীয় আয়োজন।
বৈঠকের শুরুতে সৌদি যুবরাজ এমবিএসকে পরিচয় করাতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ ওভাল অফিসে আমরা অত্যন্ত সম্মানিত এক ব্যক্তিকে স্বাগত জানাচ্ছি। তিনি বহু বছর ধরে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।’
এই প্রসঙ্গেই তিনি আক্রমণাত্মক সুরে সমালোচনা করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে। ২০২২ সালে সৌদি সফরে বাইডেন যুবরাজের সঙ্গে করমর্দন না করে ফিস্ট বাম্প দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন—যা ট্রাম্পের ভাষায়, রাজকীয় মর্যাদার সঙ্গে বেমানান।
ট্রাম্প বলেন, ‘আপনি যখন প্লেন থেকে নেমে বিশ্বের অন্যতম সম্মানিত ভবিষ্যৎ রাজার সঙ্গে দেখা করেন, তখন হাত মিলিয়ে অভ্যর্থনা জানানোই শোভনীয়, ফিস্ট বাম্প নয়। ট্রাম্প ফিস্ট বাম্প দেয় না। আমি হাতটা ধরেই স্বাগত জানাই।’ বক্তব্যের পরই ট্রাম্প যুবরাজের সঙ্গে করমর্দন করে নিজের মন্তব্যের বাস্তব প্রয়োগ দেখান।
ওভাল অফিসে ট্রাম্প এবং এমবিএস সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। সেখানে বাণিজ্য থেকে শুরু করে উন্নত এফ—৩৫ যুদ্ধবিমান রিয়াদের কাছে বিক্রির বিষয়ও ছিল।
ট্রাম্প তার এফ—৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সিদ্ধান্তটি মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিন্সের সামনে চূড়ান্ত করেন। তিনি বলেন, ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার উদ্বেগগুলো সমাধান করা হবে। চুক্তির বিস্তারিত তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার না হলেও, সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে কিছু পেন্টাগন কর্মকর্তা এর বিরোধিতা করেছিলেন।
ট্রাম্প ইসরাইল এবং সৌদি আরব উভয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমার মনে হয় তারা দু’জনই এমন পর্যায়ে আছে যেখানে তাদের সেরা সরঞ্জাম পাওয়া উচিত। ইসরাইল অবগত এবং তারা খুব খুশি হবে।’
ইসরাইলি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সৌদি আরব যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অধীনে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, তবে তারা এফ—৩৫ বিক্রিতে আপত্তি করবে না। এমবিএসও বৈঠকে সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র গঠনের একটি বিশ্বাসযোগ্য এবং নিশ্চিত পথ তৈরি হলেই সৌদি আরব এই চুক্তিতে যোগ দেবে।
এছাড়াও, ট্রাম্প জানান যে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব সামরিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে একটি বৃহত্তর চুক্তি সম্পন্ন করবে এবং ইসরাইলের উদ্বেগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির দিকে এগিয়ে যাবে। দুই দেশ প্রায় ৩০০টি ট্যাঙ্ক ক্রয়ের একটি চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছে।
২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যা ও অঙ্গ—প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করার পর এটি ছিল ক্রাউন প্রিন্সের প্রথম হোয়াইট হাউজ সফর। মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করে, এমবিএস সেই হত্যাকান্ড অনুমোদন করেছিলেন।
ওভাল অফিসে এদিন সৃষ্টি হয় এক অস্বাভাবিক দৃশ্যের, যেখানে সৌদি যুবরাজ সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন। এ ঘটনা কদাচিৎ ঘটে না। খাশোগির হত্যাকান্ড এবং ৯/১১ হামলায় সৌদি নাগরিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প সাংবাদিককে ধমক দেন। ট্রাম্প খাশোগিকে ‘অত্যন্ত বিতর্কিত’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘অনেকেই সেই ভদ্রলোককে পছন্দ করতেন না। তবে তিনি (ক্রাউন প্রিন্স) এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না এবং আমরা এখানেই এটি শেষ করতে পারি।’
ক্রাউন প্রিন্স এই হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেন, এটি সৌদি আরবের জন্য ‘যন্ত্রণাদায়ক’ ঘটনা এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন কিছু না ঘটে, তার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ট্রাম্প নির্দিষ্ট কোনো বিবরণ না দিয়েই সৌদি নেতার মানবাধিকারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি, বিশেষত নারী অধিকারের সংস্কারের জন্য প্রশংসা করেন।
এমবিএস ট্রাম্পকে জানান যে, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রে তাদের আর্থিক প্রতিশ্রুতি ৬০০ বিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলার করবে। এ চুক্তির বিস্তারিত তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার না হলেও, এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেট ইঞ্জিন এবং অন্যান্য সরঞ্জামের মতো বিভিন্ন আমেরিকান ব্যবসায় বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরবকে ন্যাটোর বাইরে অন্যতম মিত্র হিসেবে মনোনীত করার ঘোষণা দেন, যা প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা দেয়।
Leave a Reply