মোঃ রাসেল সরকার:
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। নিষিদ্ধ আওয়ামী পন্থী কথিত কিছু গণমাধ্যমের অপপ্রচার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা তথ্য এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত শক্তির গুপ্ত আতঙ্কের কারণে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন সংস্থাটির সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তারা। ফলে নদীর নৌচলাচল রক্ষা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ইউএনবি-র এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে সংস্থাটি কোনো নতুন উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। উল্টো চলমান ১২টি প্রকল্পের কাজ শ্লথ হয়ে পড়েছে। অথচ নদীগুলোর নাব্য রক্ষা ও ব্যবস্থাপনা বজায় রাখার জন্য এই প্রকল্পগুলো অত্যন্ত জরুরি ছিল।
বিআইডব্লিউটিএ-র অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মিথ্যা তকমা লাগিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। ওই মহলটি বড় অঙ্কের চাঁদা ও অনৈতিক সুবিধা দাবি করছে। দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি দপ্তর, গোয়েন্দা সংস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ভিত্তিহীন অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করছে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো রকম সত্যতা যাচাই না করেই এই তথ্যগুলো কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে, যা সংস্থার ভেতর তীব্র বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে।
নদীপথ রক্ষা ও পুনরুদ্ধারের জন্য বর্তমানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক ড্রেজিং কাজ চলার কথা থাকলেও তা শ্লথ হয়ে আছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও তালিকাভুক্ত নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে,ব্রহ্মপুত্র ও ঝিনাই নদী (জামালপুর)
ধরলা নদী (কুড়িগ্রাম) তোলাই ও পুনভর্বা নদী (দিনাজপুর) বাঁশি নদী (টাঙ্গাইল)
ঘাঘোট নদী (গাইবান্ধা) নাগদা নদী (গাজীপুর) মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) এবং নারায়ণগঞ্জ ও বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন নদীপথ।
এছাড়া ঢাকা শহরকে ঘিরে বৃত্তাকার হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে) নির্মাণ, নদীর সীমানা রক্ষায় পিলার স্থাপন এবং ৩৫টি নতুন ড্রেজার সংগ্রহের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর কাজও প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিএ-র সদস্য (প্রকৌশল) রকিবুল ইসলাম তালুকদার জানান, সরকারি নির্দেশনা মেনেই প্রকল্পের যথাসময় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “একটি স্বার্থান্বেষী মহল অনৈতিক সুবিধা নিতে কর্মকর্তাদের নাম আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে। আমরা স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী। গণমাধ্যম সরাসরি যোগাযোগ করলে আমরা সব তথ্য পরিষ্কার করতে পারি, যা ভুল বোঝাবুঝি রোধে সহায়ক হবে।”
একই ধরনের তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বিআইডব্লিউটিএ-র নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) মো. মামুন উর রশিদ বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকে একটি কুচক্রী মহল ব্যক্তিগত স্বার্থ ও জোরপূর্বক মোট অংকের চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। এটি সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। তবে এই কূটকৌশল আমাদের পেশাদার অবস্থান থেকে একচুলও সরাতে পারবে না।” এ-ই কুচক্রী মহলের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করি। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে জানতে পারি এ চক্রটি নিষিদ্ধ আওয়ামী পন্থী তারা বর্তমান সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প গুরু ধ্বংস করার লক্ষ্যে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে, এই চক্রের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখছেন অপরাধ ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, “পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়, আর এই সুযোগটি নেয় কিছু সুযোগসন্ধানী অপরাধী চক্র। ভুয়া অভিযোগ ও চাঁদাবাজিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করা একটি গুরুতর অপরাধ। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা রক্ষা করার পাশাপাশি এ ধরনের কুচক্রী মহলকে কঠোর আইনের আওতায় না আনলে জনস্বার্থের বড় প্রকল্পগুলো হুমকির মুখে পড়বে।”
আইন ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সাইবার স্পেস ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মানহানি করা এবং মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ব্ল্যাকমেইলিং করার প্রবণতা সাইবার নিরাপত্তা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। গুজব ছড়িয়ে পরিবেশ অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের দাবি জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত এই অপপ্রচারকারীদের চিহ্নিত করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সচল রাখতে এবং জনস্বার্থে ড্রেজিং ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর গতি ফিরিয়ে আনতে সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিৎ বলে মনে করেন তারা।
অপপ্রচার ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সাংবাদিক নেতাদের কঠোর হুঁশিয়ারি,বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)-এর নেতৃবৃন্দ মনে করেন, গণমাধ্যমের নাম ভাঙিয়ে কিছু কুচক্রী মহলের এই ধরনের ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজি স্বাধীন সাংবাদিকতার নীতি পরিপন্থী। বিএফইউজে এবং ডিইউজে নেতৃবৃন্দের যৌথ প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়, “৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর একটি স্বার্থান্বেষী চক্র ভুয়া সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিকল্পিত গুজব ছড়িয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। সৎ ও পেশাদার সাংবাদিকদের নাম বা গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে এ ধরনের অপপ্রচার চালানো অত্যন্ত দুভার্গ্যজনক। অপসাংবাদিকতা ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত যেই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-এর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, “সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্যনিষ্ঠতা ও বস্তুনিষ্ঠতা। কোনো রকম তথ্য যাচাই না করে মনগড়া সংবাদ প্রকাশ করা বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে ব্ল্যাকমেইল করার হাতিয়ার হিসেবে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা সাংবাদিকতার নীতিকে কলুষিত করে। বিআইডব্লিউটিএ’র মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাধর্মী সংস্থাকে নিয়ে চলমান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার রোধে প্রকৃত গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সজাগ থাকতে হবে।”
সাংবাদিক নেতারা আরও জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও ড্রেজিংয়ের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি সচল রাখতে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের কোনো বিকল্প নেই। তাই ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অপপ্রচারকারীদের মুখোশ উন্মোচনে পেশাদার গণমাধ্যমগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
Leave a Reply