নুরে আলম শাহ, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
দৌড় শুধু শরীরকে সুস্থ রাখার মাধ্যম নয়; কখনো কখনো দৌড় হয়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন তৈরির এক অনন্য ভাষা। সেই দৌড়ের ছন্দেই এবার একত্রিত হলেন দেশের বিভিন্ন জেলার দৌড়বিদরা। রাষ্ট্রপতির জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য ‘ঠাকুরগাঁও হাফ ম্যারাথন ২০২৬’।
স্বাস্থ্য, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের বার্তা ছড়িয়ে দিতে আয়োজিত এ হাফ ম্যারাথন উৎসর্গ করা হয়েছে বাংলাদেশের ২৩তম নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। আয়োজনকে ঘিরে ঠাকুরগাঁও শহরে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। শহরের নীরবতা ভেঙে আব্দুর রশিদ ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় দৌড়। কেউ ছুটেছেন নিজের রেকর্ড ভাঙার প্রত্যয়ে, কেউ সুস্থ ও সুন্দর জীবনের বার্তা নিয়ে। আবার কারও কাছে এ দৌড় ছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির নতুন বন্ধন তৈরির সুযোগ।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দৌড়বিদদের অংশগ্রহণে মুখর হয়ে ওঠে ঠাকুরগাঁওয়ের রাজপথ।
ম্যারাথনে অংশ নেওয়া ঢাকা থেকে আসা কিশোরী জিন্নাথ পারভীন বলেন, “এ ম্যারাথন শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়। এটি এক জেলার সঙ্গে আরেক জেলার এবং একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের হৃদয়ের সংযোগ তৈরি করছে। সুস্থতা, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের জয়গানকে সামনে রেখে এমন আয়োজন সত্যিই আনন্দের।”
‘সুস্থতা, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের জয়গানে’—এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও রানার্সের উদ্যোগে আয়োজিত হয় ‘ঠাকুরগাঁও হাফ ম্যারাথন ২০২৬’। আয়োজনটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল মেসার্স গার্ডেনিয়া।
এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশেষ আবেগ ও সম্মানের বিষয়। রাষ্ট্রপতির জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হাফ ম্যারাথনটি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উৎসর্গ করা হয়।
আয়োজকদের ভাষ্য, একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। একই সঙ্গে খেলাধুলার সঙ্গেও রয়েছে তার নিবিড় সম্পর্ক। সাবেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়ামোদী রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান জানাতেই এবারের আয়োজন তাকে উৎসর্গ করা হয়েছে।
তরুণ রানার এলিন খান বলেন, “একজন দৌড়বিদের কাছে প্রতিটি কিলোমিটারই নতুন চ্যালেঞ্জ। শ্বাস ভারী হয়, পা ক্লান্ত হয়ে আসে, কিন্তু থেমে গেলে চলে না। কারণ গন্তব্য শুধু ফিনিশিং লাইন নয়; নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করাই আসল লক্ষ্য। সেই জয়কে উদযাপন করতেই আমরা একসঙ্গে ছুটছি।”
তবে ঠাকুরগাঁওয়ের এই আয়োজনের গল্প শুধু দৌড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অতিথি ও দৌড়বিদদের সামনে তুলে ধরা হয় ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দৌড়ের পাশাপাশি জেলার ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখানো হয় অংশগ্রহণকারীদের।
আয়োজকদের মতে, একদিকে শরীরচর্চার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে ঠাকুরগাঁওকে নতুনভাবে পরিচিত করিয়ে দেওয়াই ছিল এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
একজন মানুষ যখন অন্য জেলার মাটিতে দৌড়ান, তখন শুধু তার পায়ের ছাপই পড়ে না; সেই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে পরিচয়, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা। তাই ঠাকুরগাঁও এবার শুধু একটি ম্যারাথনের আয়োজক নয়, বরং দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষের মিলনমেলারও সাক্ষী হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও রানার্সের প্রধান পৃষ্ঠপোষক নুর ই শাহাদাত স্বজন বলেন, “আমরা চাই খেলাধুলার মাধ্যমে মানুষকে একত্রিত করতে। রাষ্ট্রপতির জেলা হিসেবে ঠাকুরগাঁওকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে এবং তরুণদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করতেই আমাদের এই আয়োজন।”
দৌড় প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেন ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. শহীদ উজ জামান। এ সময় শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, আয়োজক, দৌড়বিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
‘ঠাকুরগাঁও হাফ ম্যারাথন ২০২৬’ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়—এটি স্বাস্থ্য সচেতনতা, সম্প্রীতি, বন্ধুত্ব ও ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে দেশব্যাপী তুলে ধরার এক প্রাণবন্ত আয়োজন হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
Leave a Reply