শুধু প্রেরণা হয়েই থেকো
মাধুরী ব্যানার্জী
বৃষ্টিভেজা জানালার পাশে বসে অরূপ পুরোনো খাতাটার পাতা উল্টাচ্ছিল। পাতাগুলোর ভাঁজে ভাঁজে জমে ছিল অসমাপ্ত কবিতা, ভাঙা স্বপ্ন আর কিছু নাম—যাদের কোনোদিন উচ্চারণ করা হয়নি।
একটি পাতায় হঠাৎ চোখ আটকে গেল।
লেখা ছিল—
“তুমি পাশে না থাকলেও, তোমার বিশ্বাসটা যেন আমার সঙ্গে থাকে।”
অরূপের মনে পড়ে গেল প্রীতি র কথা।
বছর পাঁচেক আগে, যখন অরূপ জীবনের এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন প্রীতি ই বলেছিল,
“হেরে যাওয়া মানে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনও কখনও একটু থেমে যাওয়াও নতুন করে শুরু করার প্রস্তুতি।”
কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু অরূপের কাছে সেটাই হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার সাহস।
তারপর জীবন তাদের দুজনকে দুই ভিন্ন পথে নিয়ে গিয়েছিল। যোগাযোগ কমেছে, দূরত্ব বেড়েছে, কিন্তু প্রীতির সেই কথাগুলো অরূপের ভিতরে রয়ে গেছে।
আজ অরূপ একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক। তার বই প্রকাশিত হয়, মানুষ তার লেখা পড়ে, অনুষ্ঠানে তাকে ডাকা হয়। অথচ নিজের সাফল্যের প্রতিটি মুহূর্তে সে মনে মনে একজন মানুষকেই খুঁজে বেড়ায়।
সেদিন একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে অরূপ পুরস্কার নিতে মঞ্চে উঠল।
হাততালির মধ্যে দাঁড়িয়ে সে মাইক্রোফোনের সামনে বলল—
“এই পুরস্কার আমার একার নয়। এমন একজন মানুষের জন্য, যিনি আমার জীবনে এসে কোনো দাবি রাখেননি, শুধু বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। তিনি আজ আমার পাশে নেই, কিন্তু তার বিশ্বাস আমার প্রতিটি পদক্ষেপে আছে।”
অনুষ্ঠান শেষে অরূপ বাইরে বেরিয়ে এল।
আকাশে তখন মেঘ কেটে চাঁদ উঠেছে।
ফোনে হঠাৎ একটি ছোট্ট বার্তা এল—
“তোমার বইটা পড়লাম। তুমি পেরেছ।”
নামটি দেখেই অরূপের বুকটা কেঁপে উঠল—প্রীতি।
অনেক কথা লিখতে গিয়েও সে কিছু লিখল না।
শুধু উত্তর দিল—
“তুমি পাশে থেকো না, দূরে থেকো। শুধু প্রেরণা হয়েই থেকো।”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
“প্রেরণা কখনও দূরে থাকে না। সে মানুষের কাজের মধ্যে, স্বপ্নের মধ্যে, সাহসের মধ্যে বেঁচে থাকে।”
অরূপ ফোনটা বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকাল।
চাঁদের আলোয় তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
সে বুঝল—সব মানুষ জীবনে থাকার জন্য আসে না। কেউ কেউ আসে পথ দেখাতে। কেউ হাত ধরে না, শুধু অন্ধকারে একটি প্রদীপ জ্বেলে দিয়ে চলে যায়।
আর সেই আলোই কখনও কখনও মানুষকে তার নিজের গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
প্রীতি তার জীবনের মানুষ হয়ে থাকেনি—
কিন্তু তার জীবনের প্রেরণা হয়ে রয়ে গেছে।
Leave a Reply