নেত্রকোণা প্রতিনিধি
নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি ফৌজদারি মামলার মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অন্তঃসত্ত্বা এক গৃহবধূকে মারধর ও লাথি মারার ঘটনায় গর্ভপাতের অভিযোগ থাকলেও আদালতে পাঠানো মেডিকেল রিপোর্টে শুধু ‘পায়ে ঘষা লাগার’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার।
পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই ওই রিপোর্টকে ‘ভুয়া’ দাবি করে চিকিৎসকদের স্বাক্ষর জাল হওয়ার কথা জানায়। ঘটনাটি নিয়ে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী সালমান শাহ্।
শনিবার অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন নেত্রকোণার জেলা সিভিল সার্জন ডা. গোলাম মাওলা। এর আগে গত বুধবার ভুক্তভোগী আশা আক্তারের (২১) স্বামী সালমান শাহ এই অভিযোগ করেন। তিনি মোহনগঞ্জ উপজেলার সুয়াইর গ্রামের বাসিন্দা।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, গত ৩ জুন তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ফেরদৌস মিয়া অন্তঃসত্ত্বা আশা আক্তারকে মারধরের একপর্যায়ে তলপেটে লাথি মারেন। সে সময় আশা আক্তার তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। আঘাতের পরপরই তার রক্তক্ষরণ শুরু হলে তাকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি এবং আলট্রাসনোগ্রাফি করার পরামর্শ দেন চিকিৎসক।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিনই স্থানীয় একটি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে করা আলট্রাসনোগ্রাফিতে তিন মাসের জীবিত ভ্রূণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কিন্তু পরদিন ৪ জুন অন্য একটি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের পরীক্ষায় ‘নরমাল স্টাডি’ উল্লেখ করা হয়। এতে পরিবারের দাবি, আগের আঘাতের কারণেই গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ফেরদৌস মিয়ার বিরুদ্ধে মোহনগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ৫ জুন আশা আক্তারকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ছাড়পত্র দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহনগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জয় পাল মেডিকেল রিপোর্ট চেয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবেদন করেন। ২৮ জুন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে রিপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও তার আগের দিন ২৭ জুন সেটি সরাসরি আদালতে পাঠানো হয়। পরে তদন্ত কর্মকর্তাকে একটি অনুলিপি দেওয়া হয়।
সালমান শাহর অভিযোগ, আদালতে পাঠানো ওই রিপোর্টে গর্ভপাত বা তলপেটের আঘাত সংক্রান্ত কোনো তথ্যই উল্লেখ করা হয়নি। বরং সেখানে শুধু ‘পায়ে ঘষা লাগা’ ধরনের সামান্য আঘাতের কথা লেখা হয়। তার দাবি, ওই রিপোর্ট আদালতে জমা হওয়ার পরদিনই মামলার আসামি ফেরদৌস মিয়া জামিন পান।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি জানানো হলে ২ জুলাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে নতুন করে একটি মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়া হয়। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগের রিপোর্টটিকে ভুয়া বলে দাবি করেন এবং জানান, সেখানে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।
সালমান শাহ প্রশ্ন তুলে বলেন, যদি প্রথম রিপোর্টটি ভুয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কীভাবে সরকারি হাসপাতাল থেকে আদালত ও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাল? তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. অলক কান্তি তালুকদার বলেন, “প্রথম মেডিকেল রিপোর্টটি আমি দেখেছি। সেখানে আমার স্বাক্ষরসহ আরও দুই মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। আমি ওই রিপোর্টে কোনো স্বাক্ষর করিনি। বিষয়টি অবশ্যই তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
একই অভিযোগ করেন মেডিকেল অফিসার ডা. পার্থ সেন ও ডা. মোস্তাফিজুর রহমান। তারা জানান, রিপোর্টে ব্যবহৃত স্বাক্ষর তাদের নয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোমেনুল ইসলাম বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী মেডিকেল রিপোর্ট আমার কার্যালয় থেকেই ইস্যু হয় এবং তার রেজিস্টার সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু প্রথম রিপোর্টের কোনো তথ্য আমাদের রেজিস্টারে নেই। ২ জুলাই বিধি অনুযায়ী নতুন রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। আগের রিপোর্টটি ভুয়া।”
জেলা সিভিল সার্জন ডা. গোলাম মাওলা বলেন, “অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অনিয়ম বা জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Leave a Reply