শেখ মাহতাব হোসেন ডুমুরিয়া খুলনা।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার শিক্ষা অঙ্গনে সাজিয়াড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি অতি পরিচিত নাম। আর এই প্রতিষ্ঠানকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য, তিনি হলেন প্রতিষ্ঠানটির সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম মোড়ল। টানা দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি তিনি কর্মজীবন থেকে অবসরে গিয়েছেন।
একজন অনুকরণীয় শিক্ষক, প্রাজ্ঞ অভিভাবক ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষ হিসেবে তিনি কীভাবে সহকর্মীদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন, সে বিষয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন তাঁরই দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও সাজিয়াড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক। নিচে সেই সাক্ষাৎকারভিত্তিক বিশেষ প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো:
সাক্ষাৎকার: “তিনি শুধু প্রধান শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন আমাদের আস্থার রূপকার”
প্রশ্ন: আপনার পেশাগত জীবনের শুরুতেই স্যারকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালে যখন তিনি সাজিয়াড়া মডেল স্কুলে যোগ দেন, প্রাথমিক অনুভূতি কেমন ছিল?
উত্তর: ২০০৮ সাল, তখন আমার চাকরির সবেমাত্র ৫ বছর। নতুন প্রধান শিক্ষকের আগমনের খবরে আমাদের মনে এক ধরনের ভয়, দ্বিধা ও জড়তা কাজ করছিল। ভাবছিলাম কেমন হবেন নতুন স্যার! কিন্তু দিন যত পার হতে লাগল, আমরা অবাক হয়ে দেখলাম। তিনি খুব অল্প সময়েই স্নেহ ও ভালোবাসার ছায়ায় আমাদের সবাইকে নিজের করে নিলেন।
প্রশ্ন: সহকর্মীদের সাথে তাঁর সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা কেমন ছিল?
উত্তর: স্যারের তত্ত্বাবধানে আমাদের পুরো স্কুল কার্যক্রমে এক আমূল পরিবর্তন আসে। একটানা ১১ বছর আমি তাঁর সান্নিধ্যে থেকে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নমূলক অনেক কাজ শিখেছি। তিনি শুধু প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন না; সহকর্মীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি বিশাল পারিবারিক আবহ। আমার পেশাগত জীবনে তাঁর মতো সৎ, বিচক্ষণ, ধৈর্যশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। কীভাবে মানুষকে ভালোবেসে আপন করে নিতে হয়, এটাই ছিল তাঁর আসল শক্তি।
প্রশ্ন: একজন মানুষ ও শিক্ষক হিসেবে স্যারের বিশেষ কোন গুণটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে?
উত্তর: স্যারের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ ছিল প্রবল। যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি তিনি চরম বুদ্ধিমত্তার সাথে সমাধান করতেন। কারও ওপর রাগ, অভিমান বা অভিযোগ পুষে রাখতেন না—মানুষ হিসেবে এমন গুণ অর্জন সত্যিই কঠিন। জাত, ধর্ম বা শ্রেণি ভেদাভেদ না করে সর্বস্তরের মানুষের উপকারে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। স্কুলের ড্রয়ার থেকে চকলেট বা বিস্কুট এগিয়ে দিয়ে ‘কোনটা নিবেন?’ বলে যেভাবে তিনি সহকর্মীদের আপ্যায়ন করতেন, সেই ছোট ছোট ভালোবাসাগুলো সারাজীবন মনে রাখার মতো।
প্রশ্ন: ২০১৯ সালে আপনি অন্য স্কুলে বদলি হয়ে যাওয়ার পরও কি তাঁর সাথে এই ভালোবাসার সম্পর্ক বজায় ছিল?
উত্তর: অবশ্যই। ২০১৯ সালে আমি মডেল স্কুল ছাড়ার পরও তিনি সবসময় অভিভাবকের মতো খোঁজখবর রেখেছেন। যেকোনো সমস্যায় তিনি ছিলেন আমার সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। সবসময় মনে হতো—‘স্যার তো আছেন, একটা না একটা সমাধান ঠিকই পেয়ে যাব।’
প্রশ্ন: তাঁর বিদায়বেলার মুহূর্তটি কেমন ছিল?
উত্তর: কর্মক্ষেত্র থেকে বিদায় একদিন অবধারিত, এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু স্যারের বিদায়টা মেনে নেওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর ছিল। বিদায়বেলায় গিয়ে মনকে শক্ত রাখার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমরা কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। সেদিন প্রতিটি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার প্রকাশই প্রমাণ করেছে তিনি কতটা উঁচুমাপের মানুষ ছিলেন। আমি হৃদয়ের গভীর থেকে বলি—আমার পেশাগত জীবনে শ্রদ্ধার সাথে অনুসরণ করার মতো প্রধান শিক্ষক উনি একজনই।
বিশ্লেষণ: প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত
উক্ত সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিকথা বিশ্লেষণ করলে একজন আদর্শ শিক্ষকের কয়েকটি মৌলিক দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
মানবিক নেতৃত্ব (Human-centric Leadership): প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ না করে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে কাজ আদায় করে নেওয়াই ছিল তাঁর মূল শক্তি। তিনি কর্মক্ষেত্রে কোনো ‘বস কালচার’ গড়ে তোলেননি, বরং তৈরি করেছিলেন একটি পারিবারিক পরিবেশ।
সমস্যা সমাধানের প্রজ্ঞা: সহকর্মীদের মধ্যে কোনো দূরত্ব তৈরি হতে না দেওয়া এবং সব ধরনের সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে সর্বস্তরের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
স্থায়ী প্রভাব (Lasting Legacy): একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন না; তিনি কীভাবে অনুজদের জন্য একজন আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠেন—বিদায়বেলায় সহকর্মীদের এই অশ্রুসিক্ত ভালোবাসাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
সাজিয়াড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন এবং শিক্ষার প্রসারে জনাব মোঃ শহিদুল ইসলাম মোড়লের অবদান খুলনার শিক্ষা অঙ্গনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
প্রার্থনা ও শুভকামনা: বিদায়ী এই নক্ষত্রের অবসরোত্তর জীবন কাটুক আনন্দে, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুতে।
Leave a Reply