স্মৃতির অনন্ত আলো
-মাধুরী ব্যানার্জী
বাড়িটার উঠোনে এখন আর বিকেলের কোলাহল নেই। পুরোনো আমগাছটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ছায়ায় আর কেউ গোল হয়ে বসে গল্প করে না। সময় যেন ধুলো হয়ে জমেছে বারান্দার প্রতিটি ইঁটে।
অনিন্দিতা বহু বছর পর পৈতৃক বাড়িতে ফিরেছে। শহরের ব্যস্ত জীবন তাকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর বাড়িটা প্রায় জনশূন্য। একদিন পুরোনো কাঠের আলমারি গুছাতে গিয়ে সে একটি ছোট্ট টিনের বাক্স পেল। বাক্সের ভেতরে কিছু বিবর্ণ ছবি, কয়েকটি চিঠি আর একটি কেরোসিনের লণ্ঠনের ছোট কাঁচ।
কাঁচটি হাতে নিয়ে তার মনে পড়ে গেল সেই রাতগুলোর কথা। গ্রামের ঘন অন্ধকারে বিদ্যুৎ থাকত না। বাবা লণ্ঠন জ্বালিয়ে বলতেন, — “আলো শুধু চোখে নয় মা, মনে জ্বালিয়ে রাখতে হয়।”
সেই আলোয় পড়তে পড়তেই অনিন্দিতা একদিন বড় হয়েছিল। বড় শহরে চাকরি পেয়েছিল। কিন্তু সাফল্যের ব্যস্ততায় বাবার সেই কথাগুলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল।
চিঠিগুলোর একটি খুলতেই বাবার হাতের লেখা চোখে পড়ল—
“যেদিন আমি থাকব না, সেদিন যদি কখনও একা লাগে, তবে মনে রেখো— মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা কখনও বাড়ি ছেড়ে যায় না। স্মৃতিই তখন পথ দেখায়।”
চোখের কোণে অশ্রু জমল। এত বছর ধরে সে ভেবেছিল, স্মৃতি শুধু কষ্ট দেয়। কিন্তু সেদিন বুঝল, স্মৃতি আসলে অন্ধকারের মধ্যে জ্বলে থাকা একটি প্রদীপ—যার আলো নিভে যায় না।
পরদিন সকালে অনিন্দিতা সিদ্ধান্ত নিল, বাড়িটিকে আর পরিত্যক্ত থাকতে দেবে না। সে গ্রামের শিশুদের জন্য একটি ছোট পাঠাগার গড়ে তুলল। নাম দিল “অনন্ত আলো”। বাবার পুরোনো বই, নিজের সংগ্রহ আর মানুষের দান—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে পাঠাগারটি প্রাণ ফিরে পেল।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটি লণ্ঠন সেখানে জ্বালানো হতো। শিশুরা যখন বই পড়ত, অনিন্দিতার মনে হতো, সেই আলোয় বাবার হাসিমাখা মুখ এখনও ভেসে আছে।
একদিন এক ছোট্ট মেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, — “দিদি, এই লণ্ঠনটা কেন প্রতিদিন জ্বালান?”
অনিন্দিতা মৃদু হেসে বলল, — “কারণ কিছু আলো বিদ্যুতে জ্বলে না, জ্বলে স্মৃতিতে। আর সেই আলোই মানুষকে পথ দেখায়।”
সন্ধ্যার আকাশে তখন একে একে তারা ফুটছিল। অনিন্দিতা বুঝল, মানুষের জীবন একদিন শেষ হয়, কিন্তু তার ভালোবাসা, শিক্ষা আর স্নেহ স্মৃতির ভেতর অনন্ত আলোর মতো জ্বলতে থাকে।
সেই দিন থেকে গ্রামের মানুষ বলত—
“যে মানুষ ভালোবাসা দিয়ে যায়, সে কখনও হারিয়ে যায় না; সে স্মৃতির অনন্ত আলো হয়ে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে।”
Leave a Reply