নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
রাজধানীর পার্শ্ববতী দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবিতে এক ঠিকাদারী ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের অভিযোগ মামলা হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর গাছ লাগানোর ঠিকাদার মোঃ নিজামুদ্দিন (৪২) এই নৃশংস হামলার শিকার হন। অভিযুক্ত প্রধান ব্যক্তি স্থানীয় বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকদলের সাধারন সম্পাদক ফয়েজ আহম্মেদ শাহীন এবং তার সহযোগীরা ঠিকাদার নিজামুদ্দিনকে একটি মাজারের অফিসে নিয়ে উল্টো করে ঝুলিয়ে মারধর করে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাদা স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায় করেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং অভিযুক্ত শাহীনকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
নির্যাতনের শিকার নিজামুদ্দিনের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানাধীন হাসনাবাদ এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিজামুদ্দিন তার বন্ধু ইউসুফ মিয়ার সঙ্গে স্থানীয় একটি চায়ের দোকানের সামনে অবস্থান করছিলেন। এসময় হঠাৎ ৫ থেকে ৬টি মোটরসাইকেলের একটি বহর নিয়ে একদল সন্ত্রাসী সেখানে উপস্থিত হয়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ত্রাসীরা নিজামুদ্দিনকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।
অপহরণের পর নিজামুদ্দিনকে হাসনাবাদস্থ হযরত কামুচাঁন শাহ (র:) এর মাজারের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত একটি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। ভুক্তভোগীর বর্ণনামতে, সেখানে তাকে নিয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় পৈশাচিক নির্যাতন। হামলাকারীরা তার হাত-পা প্লাস্টিকের ফিতা দিয়ে শক্ত করে বাঁধে। এরপর তাকে সিলিং ফ্যানের হুকের সঙ্গে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এই অবস্থায় প্রধান অভিযুক্ত শাহীনের নেতৃত্বে ওসমান, কদর, ইউসুফ সরদারসহ অন্যরা বাঁশ ও কাঠের লাঠি দিয়ে তাকে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে নিজামুদ্দিনের নাক ও মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং তার সারা শরীর নীলাফোলা জখমে ভরে যায়।
নৃশংস মারধরের মাঝেই অভিযুক্ত শাহীন দাবি করেন যে, নিজামুদ্দিনকে এখনই ৫০ লাখ টাকা এনে দিতে হবে। এই টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে নিজামুদ্দিন আকুতি-মিনতি করলেও হামলাকারীরা কর্ণপাত করেনি। এক পর্যায়ে তিনটি নন-জুডিশিয়াল সাদা স্ট্যাম্পে তার জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয় এবং সেখানে ৫০ লাখ টাকা দেনা রয়েছে এমন অংক বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয় বলে ভুক্তভোগী অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।
দীর্ঘক্ষণ নির্যাতনের পর মুমূর্ষু অবস্থায় নিজামুদ্দিনকে একটি অটোরিকশায় তুলে দিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। পরে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও শরীরের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে আত্মীয়-স্বজনের পরামর্শে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী নিজামুদ্দিন জানান, তিনি ২০২০ সাল থেকে বিআইডব্লিউটিএর একজন তালিকাভুক্ত ঠিকাদার হিসেবে হাসনাবাদ বড় মসজিদের ঢাল থেকে মীরেরবাগ হয়ে ঢাকা জুট মিলস পর্যন্ত নদীর পাড়ে গাছ লাগানো ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সম্প্রতি একই কাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শাহীন ও তার লোকজনের সঙ্গে তার বিরোধের সৃষ্টি হয়। এই ঠিকাদারী কাজ থেকে তাকে সরিয়ে দিতেই মূলত এই পরিকল্পিত অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখিত আসামিরা হলেন শাহীন (৪৬), মোঃ ওসমান (২৮), কদর (৩০), ইউসুফ সরদার (৫০), মোঃ রানা (৩০), সৌরভ (৩০), মোঃ রনি (৫০) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জন। অভিযুক্তরা সবাই হাসনাবাদ মোকামপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
এদিকে, এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুন রায় চৌধুরী এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছেন, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে শাহীনকে দলের সকল পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপি কোনোভাবেই চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানা পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগটি গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয়েছে। অপহরণ, চাঁদাবাজি, হত্যাচেষ্টা এবং জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায়ের মতো গুরুতর অপরাধের ধারা অনুযায়ী মামলা রুজু করার প্রক্রিয়া চলছে। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে।
দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের এই লোমহর্ষক ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। সাদা স্ট্যাম্পে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া এবং প্রকাশ্য দিবালোকে অপহরণের মতো ঘটনা আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সুশীল সমাজ। এখন সবার নজর পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ ও আসামিদের গ্রেপ্তারের দিকে।
Leave a Reply