ছায়ার আলপনা
-মাধুরী ব্যানার্জী
বর্ষার শেষ বিকেল। গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো বাড়ি—মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল, আর উঠোন জুড়ে একটি বিশাল শিউলি গাছ। বাড়িটিতে থাকতেন আশালতা দেবী। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও তাঁর চোখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তির দীপ্তি।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি উঠোনে চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা আঁকতেন। আশ্চর্যের বিষয়, ভোরে দেখা যেত আলপনার পাশে আরও কিছু নকশা ফুটে উঠেছে—যেন কারও অদৃশ্য হাত রাতের আঁধারে তাকে পূর্ণতা দিয়েছে।
গ্রামের লোকেরা বলত, “এ বাড়িতে নিশ্চয়ই অলৌকিক কিছু আছে।”
কিন্তু আশালতা দেবী শুধু হেসে বলতেন, “যেখানে ভালোবাসা থাকে, সেখানে ছায়াও কথা বলতে শেখে।”
এই রহস্যের টানেই শহর থেকে এল চারুকলার ছাত্রী ময়ূরী। সে লোককলা নিয়ে গবেষণা করছিল। কয়েকদিন বাড়িটিতে থেকে সে লক্ষ্য করল, আশালতা দেবী প্রতিটি আলপনা আঁকার আগে চোখ বন্ধ করে কারও উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেন।
একদিন সাহস করে ময়ূরী জিজ্ঞেস করল, —“ঠাকুমা, আপনি কার সঙ্গে কথা বলেন?”
আশালতা দেবী মৃদু হেসে বললেন, —“যে মানুষগুলো চলে যায়, তারা কি সত্যিই হারিয়ে যায়? স্মৃতির ভেতর তারা ছায়া হয়ে থেকে যায়। আমি তাদেরই ডাকি।”
সেদিন রাতে ময়ূরীর ঘুম এল না। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো উঠোনে পড়েছে। হাওয়ায় শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে। হঠাৎ সে দেখল, গাছের ছায়া ধীরে ধীরে আলপনার উপর নেচে উঠছে। বাতাসের দোলায় সেই ছায়াগুলো এমন সুন্দর নকশা তৈরি করল, যেন প্রকৃতিই নিজের হাতে আঁকছে এক অনন্য শিল্পকর্ম।
ভোরে ময়ূরী বুঝল রহস্যের আসল মানে। অলৌকিক কিছু নয়—চাঁদের আলো, গাছের ডাল, ঝরে পড়া ফুল আর মানুষের গভীর স্মৃতি মিলে সৃষ্টি করে সেই বিস্ময়। কিন্তু আশ্চর্য ছিল, সেই নকশাগুলো ঠিক আশালতা দেবীর অসমাপ্ত রেখাগুলোকেই সম্পূর্ণ করত।
কয়েক মাস পরে আশালতা দেবী পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
পরের শরতে ময়ূরী আবার সেই বাড়িতে ফিরে এল। উঠোন ফাঁকা, বাড়ি নিস্তব্ধ। তবু সে আগের মতোই চালের গুঁড়ো দিয়ে একটি ছোট্ট আলপনা আঁকল।
রাত কেটে গেল।
ভোরের আলো ফুটতেই সে বিস্ময়ে থমকে দাঁড়াল। আলপনার চারপাশে শিউলি ফুল ঝরে এমন এক অপূর্ব নকশা তৈরি হয়েছে, যা কোনো মানুষের হাতে সম্ভব নয়। বাতাস যেন নীরবে বলল—
“যে ভালোবাসা হৃদয়ে আঁকা থাকে, তাকে সময় মুছে দিতে পারে না।”
ময়ূরী সেদিন বুঝেছিল, ছায়া কখনও অন্ধকারের প্রতীক নয়। কখনও কখনও ছায়াই স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল রং।
সেই থেকে প্রতি শরতে গ্রামের মানুষ সেই উঠোনে আলপনা আঁকে। তারা বিশ্বাস করে, মানুষের জীবন একদিন শেষ হলেও তার স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসা ছায়ার মতো পৃথিবীতে থেকে যায়—নিঃশব্দে, অথচ গভীরভাবে।
আর সেই অদৃশ্য ভালোবাসার রেখাগুলোর নামই—ছায়ার আলপনা।
Leave a Reply