শাকিল হোসেন,কালিয়াকৈর (গাজীপুর)প্রতিনিধিঃ
গাজীপুর কালিয়াকৈরে ৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গাজীপুরের হাইটেক পার্ক রেলওয়ে স্টেশন এখন সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী, উন্নত প্ল্যাটফর্ম ও লুপ লাইন থাকলেও যাত্রীর অভাবে স্টেশনটি কার্যত পরিত্যক্ত। ১২ জন স্টাফ থাকার কথা থাকলেও দায়িত্বে আছেন মাত্র ৬ জন। দিনে ১৬ জোড়া অর্থাৎ ৩২টি ট্রেন চলাচল করলেও যাত্রাবিরতি দেয় শুধু একটি লোকাল ট্রেন। স্টেশন পরিচালনায় মাসে খরচ হয় প্রায় ৪ লাখ টাকা, অথচ টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয় মাত্র ১ লাখ ২০-৩০হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে ২ লাখ ৫০-৭০ হাজার টাকার বেশি লোকসান গুনছে রেলওয়ে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, হাইটেক পার্ক স্টেশনে স্টেশন মাস্টার, বুকিং সহকারী, পয়েন্টসম্যান, নিরাপত্তা প্রহরীসহ ১২টি অনুমোদিত পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৬ জন। এর মধ্যে স্টেশন মাস্টার ও নিরাপত্তা প্রহরীর পদ শূন্য। বুকিং সহকারীকে একই সাথে টিকিট বিক্রি, সিগন্যাল ও পরিষ্কারের কাজ করতে হয়। জনবল সংকটে ভিআইপি লাউঞ্জ, ওয়েটিং রুম, টয়লেটসহ বেশিরভাগ অংশ তালাবদ্ধ থাকে। অযত্নে নষ্ট হচ্ছে এসি, ফ্যান ও আসবাবপত্র।
সন্ধ্যার পর স্টেশন এলাকা অন্ধকার ও জনশূন্য হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। নিরাপত্তাহীনতার কারণে দায়িত্বরত স্টাফরাও জানমালের ভয়ে ঘরে তালা মেরে বসে থাকেন। স্টেশন সহকারী মাস্টার খায়রুল ইসলাম বলেন,-১২ জন স্টাফের জায়গায় আছি ৬ জন। স্টেশন মাস্টার নাই, নিরাপত্তা প্রহরী নাই। সন্ধ্যার পর আমরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকি। তালা লাগিয়ে বসে থাকতে হয়। ৪০টা ট্রেন যায় হাইটেক সিটি হয়ে, থামে মাএ ১ টি। বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ বিলসহ মাসে খরচ ৪ লাখের বেশি। আয় হয় ১ লাখ ২০-৩০ হাজার। পুরাই লোকসানি প্রকল্প। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েছি, কাজ হয় না।
২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর ৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে স্টেশনটি উদ্বোধন করা হয়। সাভার ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চল এবং বাংলাদেশ হাইটেক সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি সংলগ্ন হওয়ায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার যাত্রীকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। হাইটেক পার্কে কর্মরত ১৫ হাজারের বেশি তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী, শিল্পাঞ্চলের লক্ষাধিক শ্রমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সারাদিন ফাঁকা পড়ে থাকে প্ল্যাটফর্ম।
বর্তমানে শুধু সকালে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনটি এখানে এক মিনিটের যাত্রাবিরতি দেয়। টিকিট বরাদ্দ থাকে মাত্র ৭০ থেকে ৮০টি। কোনো আন্তঃনগর ট্রেন থামে না। ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল-উত্তরবঙ্গ রুটের কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না স্থানীয়রা।
ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী রেজওয়ান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে এত সুন্দর স্টেশন, কিন্তু আন্তঃনগর থামে না। বাধ্য হয়ে বাসে ৮০ টাকা ভাড়া দিয়ে ঢাকায় যাই। জ্যামে ৩ ঘণ্টা নষ্ট হয়। পরীক্ষার সময় খুব সমস্যা হয়। জামাল হোসেন নামে এক গার্মেন্টস কর্মী বলেন,কালিয়াকৈর, সফিপুর, মৌচাকের হাজারো গার্মেন্টস কর্মী ও হাইটেক পার্কের কর্মীরা এই স্টেশন ব্যবহার করতে পারতেন। ভোর ৫টায় বাইর হই, রাইত ১০টায় বাসায় ফিরি।১-২টি ট্রেন থামলে কত উপকার হইত। এখন রাস্তায় জ্যাম আর ভাড়ার জ্বালায় জীবন শেষ।
হাইটেক পার্কের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বলেন,আমরা বিদেশি ক্লায়েন্টদের নিয়ে আসি। স্টেশন দেখাই,কিন্তু ট্রেন থামে না বলতে লজ্জা লাগে। ৮৪ কোটি টাকার স্টেশন, অথচ কোনো কাজে আসে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ,পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও জিআরপি পুলিশ না থাকায় স্টেশনটি মাদকসেবী, ছিনতাইকারী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। দিনে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এসে টিকটক, রিলস বানায়। ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম আর আধুনিক ভবন তাদের ভিডিওর লোকেশন। আর সন্ধ্যার পর স্টেশনের অন্ধকার জায়গাগুলোতে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ মাদকের আসর বসে। নেশাগ্রস্তরা রেললাইনের ওপরেই পড়ে থাকে। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সন্ধ্যার পর এখানে অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে গভীর রাতে বাসায় ফেরে। রাত ৮টা-৯টার পর এই রেলস্টেশনটি ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়। মানুষের চলাচল একেবারেই নেই। যা দু-একটা থাকে, তারা ছিনতাই, রাহাজানি ও মাদকসেবী বিভিন্ন মালামাল চুরি হয়েছে। নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় চুরি ঠেকানো যাচ্ছে না।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম ফখরুল হোসাইন বলেন,এই রুটে ১০-১২ হাজার যাত্রী আছে। হাইটেক পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পাঞ্চল— সব মিলিয়ে যাত্রী চাহিদা অনেক। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্য গাজীপুর-১ আসনের মজিবুর রহমানকে জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তব চাহিদা যাচাই না করে ৮৪ কোটি টাকা খরচ করা হলেও সেবা নিশ্চিত হয়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উদ্যোগ নিলে এবং গাজীপুর-১ আসনের এমপি মোঃমজিবুর রহমান যদি রেল মন্ত্রণালয়কে বলেন যে প্রতিদিন এখানে ৫টি ট্রেন থামাতে হবে, তবে রেল মন্ত্রণালয় দিতে বাধ্য থাকবে।
অবিলম্বে টাঙ্গাইল কমিউটার, সিল্কসিটি, একতা, দ্রুতযান ও সুন্দরবন এক্সপ্রেসসহ অন্তত ৪/৫টি ট্রেনের যাত্রাবিরতি,শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং জিআরপি পুলিশের টহল দাবি করেছেন তারা। অন্যথায় ৮৪ কোটি টাকার এই স্টেশনটি পুরোপুরি মাদকসেবী ও অপরাধীদের দখলে চলে যাবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
Leave a Reply