প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের, ব্যুরো চীফ নোয়াখালী:
নোয়াখালীতে ছাত্রদলের নবঘোষিত কমিটিকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের বিরুদ্ধে ‘পকেট কমিটি’ গঠনের অভিযোগ এনে তাকে জেলায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে জেলা, সদর উপজেলা ও পৌরসভা শাখাসহ বিভিন্ন ইউনিটের ১০ জন নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
সোমবার (৪ মে) দুপুরে নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদের সামনে থেকে শতাধিক নেতাকর্মী বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে মিছিলটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে মাইজদীর টাউন হল মোড়ে অবস্থান নেয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করলে পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এতে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে।
বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, ত্যাগী ও দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত অনুসারী ও সুবিধাভোগীদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা দাবি করেন, এই কমিটি কোনোভাবেই তৃণমূলের মতামতের প্রতিফলন নয়।
নোয়াখালী পৌর ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক মোহাম্মদ ওয়াসিম বলেন,“যারা আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিল, মামলা-হামলার শিকার হয়েছে, তাদের মূল্যায়ন না করে হঠাৎ করে অযোগ্য ও সুবিধাবাদীদের পদ দেওয়া হয়েছে। এই কমিটি ত্যাগীদের সঙ্গে প্রহসন ছাড়া কিছু নয়।”
সদর উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ চৌধুরী বাবু বলেন,“ছাত্রদলের ইতিহাসে এমন বিতর্কিত কমিটি আর হয়নি। প্রকৃত কর্মিদের বাদ দিয়ে গোপনে পছন্দের লোকদের পদ দেওয়া হয়েছে। এতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।”
এ সময় বক্তারা কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তারা অভিযোগ করেন,“নাছির আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। তার বাবা আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড মেম্বার ছিলেন। এখন আওয়ামী লীগের লোকজনকে ছাত্রদলে ঢুকিয়ে সংগঠনকে ধ্বংসের চেষ্টা চলছে।”
বিক্ষুব্ধ নেতারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান -এর হস্তক্ষেপ কামনা করে দ্রুত কমিটি বাতিলের দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর আন্দোলন, এমনকি হরতালের মতো কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি এনবিএস রাসেল। তিনি বলেন,
“যারা পদ পাননি তারাও ত্যাগী, এটা সত্য। কিন্তু সবাইকে একসঙ্গে পদ দেওয়া সম্ভব নয়। সাংগঠনিক দক্ষতা, যোগ্যতা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনা করেই কমিটি গঠন করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,“আমার নিজের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস দেখলেই বুঝবেন আমি মামলা-হামলার শিকার হয়েছি। কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি বা পকেট কমিটি করা হয়নি।”
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পরে বিক্ষোভ শেষে নোয়াখালী প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি সাহেদ চৌধুরী বাবু, তারেক নূর, ইয়াসিন আরাফাত, সাংগঠনিক সম্পাদক আকবর হোসেনসহ ১০ জন নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী সদর উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ চৌধুরী বাবু, পৌরসভা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ ওয়াসিম, সদস্য সচিব মোহাম্মদ সজীব, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন রকি, সাবেক সহ-সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত শুভ, ছাত্রনেতা রিজভী, তারেক নূরসহ আরও অনেকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন কমিটি ঘিরে এই প্রকাশ্য বিদ্রোহ নোয়াখালী ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।
Leave a Reply