নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর মুগদা, মান্ডা ও মানিকনগর এলাকায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার জনজীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় মুগদার ৭ ও ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন পয়েন্টে চলছে মাদকের রমরমা কারবার। বিশেষ করে কিশোর গ্যাং ও মাদকাসক্তদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ নাগরিক এবং মসজিদের মুসল্লিদের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৭ নং ওয়ার্ডের মানিকনগর বিশ্বরোড ডাল ও মানিকনগর বালুর মাঠ এলাকা এখন মাদকের অভয়ারণ্য। এছাড়া ৭১ নং ওয়ার্ডের দানবের গলির মাথা থেকে শুরু করে বায়তুল মোজাম্মেল জামে মসজিদ হয়ে মানিকনগর পাকার মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় দিনরাত চলে মাদক কেনাবেচা। মূলত বায়তুল মোজাম্মেল জামে মসজিদের পশ্চিম পাশে সোহরাব মিয়ার বাড়ির সামনের অংশটি এখন এলাকার মানুষের কাছে ‘মাদকের হাট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বিশাল মাদক সাম্রাজ্য এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন শ্রমিক লীগ নেতা ও তুরাগ বাসের হেলপার বেল্লাল ওরফে আলামিন। তার ছত্রছায়ায় ১৫-১৬ বছরের কিশোরী ও তরুণীদেরও মাদক বিক্রিতে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা এলাকার সামাজিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে কলুষিত করছে। মাদক ব্যবসার পাশাপাশি এখানে নারী পাচার ও দেহব্যবসার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
এছাড়া মুগদা–মান্ডা–মানিকনগর এলাকায় সক্রিয় সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হিসেবে দেলোয়ার ওরফে বুদ্দা, লতা, খাস, মিলন, বৃষ্টি, মিন্টু, সাকিল, রাজু, সবুজ ও রুবেলের নাম উঠে এসেছে। মান্ডা ও মদিনাবাগ এলাকায় মাদক কারবার পরিচালনায় তাসলিমা বেগম, শরিফুন বেগম, নাসির, সজিব, মনা, বেলায়েত, টুলু, মাইকেল, সাগর, রিনা, আবুল, রুমা, ইতি, জুয়েল ও শাহ আলমসহ একটি দীর্ঘ তালিকা স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরছে।
মাদকের এই ভয়াল গ্রাসের প্রভাবে এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর মাদকসেবীদের বেপরোয়া আচরণের কারণে সাধারণ মানুষ এমনকি মসজিদের মুসল্লিরাও রাস্তা দিয়ে নিরাপদে চলাচল করতে পারেন না। এক অজানা আতঙ্কে সূর্যাস্তের পরেই স্থানীয় বাসিন্দা ও ভাড়াটিয়ারা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়েছেন সাধারণ মানুষ, কারণ কথা বললেই নেমে আসে অপরাধীদের খড়্গ।
“মাদক ও জুয়া কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় না, এটি একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়। তরুণ সমাজ আজ ধ্বংসের পথে, বাড়ছে অপরাধ আর কমছে সামাজিক নিরাপত্তা। এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে সামাজিক ও প্রশাসনিক সমন্বিত প্রতিরোধ প্রয়োজন।”
সামাজিক আন্দোলনের কণ্ঠস্বর-“যুব-শক্তি সামাজিক আন্দোলন”-এর চেয়ারম্যান মোঃ রাসেল সরকার এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে বলেন, “আমরা দীর্ঘ দিন ধরে মাদক, জুয়া ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছি। একটি সুন্দর ও সুস্থ সমাজ উপহার দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই মাদকবিরোধী আন্দোলন চালাতে গিয়ে আমাদের কর্মীরা বারবার হামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। তবুও আমরা পিছু হটব না।”
জনবসতিপূর্ণ এলাকায় দিনের পর দিন প্রকাশ্য দিবালোকে এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চললেও পুলিশের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির অভাবেই অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা। অতি দ্রুত সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মুগদা ও মানিকনগর এলাকাকে মাদকমুক্ত করে জনমনে শান্তি ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply