স ম জিয়াউর রহমান, চট্টগ্রাম থেকে :
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের নাম করে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে প্রকাশ্যে খননযন্ত্র বসিয়ে পাহাড় কেটে সাবাড় করছে একটি চক্র। কোথাও নেই সরকারি অনুমোদন, প্রকল্পের নামফলক বা সতর্কতামূলক কোনো সাইনবোর্ড। দিনের পর দিন পাহাড় কাটা চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি চোখে না পড়ায় অসীম সাহসের সাথে পাহাড় কেটে সাবাড় করছে পাহাড় খেকো।
গত রোববার ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের ধুল্যাছড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি বিশাল পাহাড় কেটে সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। সড়ক নির্মাণের অজুহাতে পাশের আরও দুটি পাহাড় কাটা হয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের অধীন নারায়ণহাট রেঞ্জের ধুরুং বনবিটের সংরক্ষিত জমির অন্তর্ভুক্ত এসব পাহাড়ের মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে পাশের কৃষিজমিও। কাটা পাহাড়ের ঢালে গাছ ও বাঁশ ব্যবহার করে কয়েক কক্ষের একটি স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ জানান, সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালুর প্রস্তুতি চলছে।
পরিবেশবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুহিবুল্লাহ বলেন, পাহাড় প্রকৃতিকে ব্যালেন্স করে। পাহাড় ধ্বংস হয়ে গেলে এ দেশে বৃষ্টিপাত কমে যাবে, ভূমিধস বাড়বে। টিলা-পাহাড় কাটা আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জরুরি আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাফেজ মুহাম্মদ শাহ আলম নঈমী নামের এক ব্যক্তি রাউজান থেকে এসে প্রথমে পাইন্দং এলাকায় একটি দরবারে অবস্থান নেন। এরপর ধাপে ধাপে শুরু হয় সংরক্ষিত বনভূমি দখল ও পাহাড় কেটে সাবাড় করার রাজসিক কার্যক্রম। এ ক্ষেত্রে অনুসারীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি। প্রকাশ্যে দীর্ঘ সময় ধরে খননযন্ত্র দিয়ে পাহাড় কাটার কাজ চললেও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তেমন কোনো তদারকি নেই।
পাহাড় কাটার কাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় মাস্টার হারুন বলেন, ‘জায়গাটি মূলত রির্জাভ ফরেস্টের। আমরা গত বছর দখলে নিয়েছি। এখানে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মিত হবে। পাহাড়টি কেটে উপযোগী করতে প্রায় ১০ লাখ টাকা এক্সকাভেটর ভাড়া ব্যয় হয়েছে। বিষয়টি সবাই জানে। কেউ বাধা দেয়নি। হুজুরের দরবারে অনেক বড় সাংবাদিক, নেতা ও প্রশাসনের লোকজনও আসেন। আমাদের কিছুই হবে না।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, হাফেজ মুহাম্মদ শাহ আলম নঈমী নিজেকে পীর হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাহমাতুল্লিল আলামিন কমপ্লেক্স ও আহজমানে নঈমিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় ‘জালালিয়া রজবিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়’ স্থাপনের নামে এই পাহাড় কাটা হয়েছে। প্রায় ১ কিলোমিটার পশ্চিমে তাঁর প্রতিষ্ঠিত জালালিয়া রজবিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা। এটি নির্মাণকালেও পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছিল। পাইন্দং ইউনিয়নের আমতল রাবারবাগান এলাকায় আশরাফাবাদ দরবার শরিফের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রেও একইভাবে পাহাড় কাটার অভিযোগ আসে। স্থানীয়রা বলছেন, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায়ও তিনি একই কায়দায় দখল করা জায়গায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বারবার একই ধরনের কর্মকাণ্ড হলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি।
পাহাড় কেটে বিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়ে হাফেজ মুহাম্মদ শাহ আলম নঈমী বলেন, ‘আমি শাহজালাল বাবার নামে এখানে সড়ক নির্মাণ করেছি। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছি। এখন স্কুল প্রতিষ্ঠা করছি।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, মুহাম্মদ শাহ আলম নঈমীর প্রভাবে পাহাড় কাটা ও বনভূমি দখলের বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ডে পরিবেশের পাশাপাশি কৃষিজমি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়ছে।
ধুরুং বনবিটের কর্মকর্তা অবনী কুমার ত্রিপুরা স্বীকার করে গণমাধ্যমকে জানান, দখল করা পাহাড়টি বন বিভাগের সংরক্ষিত জমির অন্তর্ভুক্ত। নারায়ণহাট রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক খান মো. আবরারুর রহমান জানান, ‘বিষয়টি জানা ছিল না। জায়গাটি পরিদর্শন করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমানও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন।
এদিকে চট্টগ্রামের পরিবেশ, কৃষি, জলবায়ু ও সেবামূলক সংগঠন গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ও পরিবেশ সংগঠক স ম জিয়াউর রহমান বলেন, ফটিকছড়ি উপজেলার পাইন্দং এ দিন দুপুরে প্রকাশ্যে যেভাবেই পাহাড় কেটে সাবাড় করছে তা চরম উদ্বেগজনক। বিষয়টি প্রশাসন নজরদারি না করায় পাহাড়খেকো চক্র দু: সাহস দেখিয়ে পাহাড় কেটে সাবাড় করছে। তিনি ফটিকছড়ি উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
পরিবেশ সংগঠক স ম জিয়াউর রহমান আরও বলেন, আগামীকাল ৯ জানুয়ারি পাহাড় কাটার দৃশ্য সরেজমিনে পরিদর্শন করতে একটি টিম সেখানে যাবে এবং একটি প্রতিবেদন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক উপদেষ্টাকে দাখিল করবেন।
Leave a Reply