বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
বাগেরহাট সদর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপির মহিলা দলনেত্রী বর্ণী স্বরের বিরুদ্ধে দুর্গাপূজা ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেওয়া এবং জাল সনদ তৈরি করে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন আনসার সদস্যের দাবি, তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা নেওয়া হয়েছে। টাকা না দিলে ডিউটি করতে দেওয়া হবে না এবং আইডি ব্লক করে রাখার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এদিকে, জেলা কমান্ড্যান্ট সাঙ্গে
বর্ণী স্বরের যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন তার স্বামী পূর্ণ চন্দ্র দত্ত (৩২)। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পূর্ণ চন্দ্র দত্ত বাগেরহাট সদর উপজেলার ৫ নং বারুইপাড়া ইউনিয়নের কোধলা গ্রামের বাসিন্দা। ২০০৯ সাল থেকে বর্ণী স্বরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পর ২০২১ সালে ধর্মীয় রীতিতে তাদের বিয়ে হয়। তাদের চার বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ২০১৪ সালে তিনি মালয়েশিয়ায় যান। সেখানে থাকাকালে স্ত্রীর পড়াশোনা ও বাসাভাড়ার জন্য প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাতেন। এছাড়াও তার যাবতীয় খরচ পরিবারের খরচ সবকিছুই তিনি বহন করতেন যখন যেটা চাইতো তখন তাই পাঠিয়ে দিতেন টাকা-পয়সা কখনো কোন দায়ী কমতি রাখেননি এই পূর্ণচন্দ্র দত্ত্ব ।দীর্ঘ সম্পর্কের সময়ে স্ত্রীর পেছনে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। প্রায় দুই মাস ধরে স্ত্রী বাবার বাড়িতে থাকছেন। চার বছরের মেয়েকেও কাছে পাচ্ছেন না তিনি। এ নিয়ে মানসিক কষ্টে রয়েছেন বলে জানান পূর্ণ চন্দ্র।
পূর্ণ চন্দ্র বলেন, তার স্ত্রী বারুইপাড়া ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপির মহিলা দলনেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জেলা পর্যায়ের আনসার কর্মকর্তার সঙ্গে স্ত্রীর গভীর রাতে মুঠোফোনে কথা বলা এবং হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, আমার চার বছরের একটি মেয়ে আছে। মেয়ের কথা চিন্তা করে আমি সংসারটি টিকিয়ে রাখতে চাই। আমি চাই, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান হোক।নিরাপত্তার আশঙ্কায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলেও জানান তিনি।
আনসার সদস্য ইজাবুল হাওলাদারের বলেন ,দুর্গাপূজায় দায়িত্ব পালনের জন্য তার কাছ থেকে ৮২০ টাকা নেওয়া হয়েছে। জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাকে দেওয়ার কথা বলে বর্ণী স্বর ওই টাকা নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া জাল সনদ তৈরি করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে আরও ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ তার।
তিনি আরোও বলেন, গতকাল আনসারের ইউনিফর্ম দিতে গেলে আমাকে গালিগালাজ করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
শেখ শরিফুল ইসলাম নামের আরেক আনসার সদস্যের অভিযোগ, প্রথমবার নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সময় তার কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। পরে নির্বাচনী দায়িত্বের সম্মানী পাওয়ার পর আরও ৫০০ টাকা দাবি করা হয়। সেই টাকা না দেওয়ায় দুর্গাপূজার দায়িত্ব পালনের আগে তাকে আগের টাকা পরিশোধ করতে বলা হয় বলে দাবি তার।তাকে জানানো হয়, টাকা না দিলে জেলা পর্যায়ে তার আইডি ব্লক করে রাখা হয়েছে, সেটি খোলা যাবে না এবং তাকে দায়িত্বও দেওয়া হবে না। পরে বিকাশের মাধ্যমে ৮০০ টাকা দিয়েছেন তার কাছে বিকাশের মাধ্যমে পাঠানো সেই ডকুমেন্ট রয়েছে বলেও জানান। এ ছাড়া সনদ তৈরি করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে মোট ২ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে আনসার টেন্ডিং না করেও তিনি পেয়েছেন আনসারে সার্টিফিকেট। আমরা টাকা চাইতে গেলে আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
এ বিষয়ে বারুইপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাসুদ শেখ বলেন, দুর্গাপূজার সময় আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালনের জন্য কয়েকজনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৮০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ তিনি জানতে পেরেছেন। বিষয়টি যাচাই করতে সংশ্লিষ্টদের খোঁজ নিতে বলেছেন। এ-সংক্রান্ত কিছু অডিও রেকর্ড ও ভিডিও থাকার কথাও তাঁকে জানানো হয়েছে।
মাসুদ শেখ বলেন, যারা রাত জেগে দায়িত্ব পালন করেন, তারা সাধারণ মানুষ। তাদের কাছ থেকে কেউ টাকা নিয়ে থাকলে সেটি তদন্ত করে দেখা উচিত। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো অর্থ জমা দেওয়ার বিষয় থাকলে তার স্বচ্ছ হিসাব থাকতে হবে। আমি অভিযোগটির সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ৫ নং বারুইপাড়া ইউনিয়ন আনসার-ভিডিপির মহিলা দলনেত্রী বর্ণী স্বরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাগেরহাট জেলা আনসার কমান্ড্যান্ট শরিফুল ইসলাম বলেন, বারুইপাড়া ইউনিয়নের ঘটনা নিয়ে তার কাছে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন,বর্ণী স্বরের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়া বা জাল সনদ তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জেনেছি। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পূর্ণ চন্দ্র দত্তের অভিযোগ, জেলা পর্যায়ের ওই কর্মকর্তা গভীর রাতে তার স্ত্রীকে ফোন করে কথা বলতেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কমান্ড্যান্টর বক্তব্য দিতে রাজি হননি বিষয়টি অস্বীকার করেন।
ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং পরিবারের সদস্যদের যাতায়াতেও গাড়িটি ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়েও তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
বাগেরহাট সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ সামসুল আরেফিন বলেন,অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখনো তদন্তের ফল পাওয়া যায়নি। তাই টাকা নেওয়া, জাল সনদ তৈরি কিংবা সরকারি গাড়ির অপব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের পরই এসব অভিযোগের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
Leave a Reply