অদ্ভূত শূন্যতা
-মাধুরী ব্যানার্জী
বাড়িটা হঠাৎ করেই যেন বড় হয়ে গিয়েছিল।
অরুণ জানত, বাড়ির আয়তন একটুও বাড়েনি। একই বারান্দা, একই বসার ঘর, একই জানালা। তবু মায়ের চলে যাওয়ার পর প্রতিটি ঘর যেন অচেনা দূরত্বে সরে গিয়েছিল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে অভ্যাসবশত সে রান্নাঘরের দিকে তাকাত। মনে হতো, মা হয়তো চা বানাচ্ছেন। তারপরই মনে পড়ত—মা নেই।
চায়ের কাপটা টেবিলে পড়ে থাকত। খবরের কাগজ খুলে রাখা হতো। কিন্তু কাউকে আর বলতে শোনা যেত না,
“চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, খেয়ে নে।”
অরুণের কাছে এটাই ছিল শূন্যতা।
কিন্তু একদিন শূন্যতাটা অদ্ভুত হয়ে উঠল।
রাত তখন প্রায় বারোটা। হঠাৎ রান্নাঘর থেকে কাপ রাখার শব্দ এল।
টং!
অরুণ চমকে উঠল।
ধীরে ধীরে রান্নাঘরে গিয়ে দেখল—মায়ের পুরোনো কাপটা টেবিলের ওপর রাখা। অথচ কাপটি সে আলমারির একেবারে ভেতরে তুলে রেখেছিল।
পরদিন আবার একই ঘটনা।
তারপর প্রতিদিন।
অরুণ ভয় পেতে শুরু করল। এক রাতে সে ঠিক করল, ঘুমোবে না। আলো নিভিয়ে বসে রইল।
রাত বারোটার কিছু পরে—
টং!
আবার সেই শব্দ।
অরুণ ছুটে রান্নাঘরে গেল।
কেউ নেই।
শুধু টেবিলের ওপর কাপটা রাখা।
কাঁপা হাতে কাপটা তুলে নিতে গিয়ে তার চোখ পড়ল নিচে রাখা একটা ছোট কাগজে।
কাগজে মায়ের হাতের লেখা—
“তুই খুব একা হয়ে গেছিস বাবা। নিজের সঙ্গে কথা বলতে শিখিস।”
অরুণ স্তব্ধ হয়ে গেল।
হঠাৎ মনে পড়ল—মা মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে এই কথাটাই বলেছিলেন। তখন সে ব্যস্ততার অজুহাতে কথাটা শুনেও শুনতে চায়নি।
সেদিন প্রথমবার অরুণ কাঁদল।
অনেকক্ষণ ধরে।
তারপর মায়ের কাপটা বুকে চেপে বলল,
“মা, আমি একা নই। তোমার কথা আমার সঙ্গে আছে।”
সেই রাতের পর আর কখনও কাপটা নিজে থেকে টেবিলে আসেনি।
কিন্তু অরুণ বুঝেছিল, শূন্যতা আসলে সবসময় কাউকে হারানোর নাম নয়।
কখনও কখনও শূন্যতা আমাদের ভেতরের সেই দরজাটা খুলে দেয়, যেখানে প্রিয় মানুষগুলো চলে গিয়েও থেকে যায়—স্মৃতি হয়ে, শিক্ষা হয়ে, আর নীরব ভালোবাসা হয়ে।
আর সেই কারণেই অদ্ভুত শূন্যতার মধ্যেও একদিন অরুণ খুঁজে পেল বেঁচে থাকার নতুন অর্থ।
Leave a Reply