সম্পাদকীয়/মতামত
প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রথম সোপান। একটি শিশুর মেধা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও স্বপ্নের ভিত তৈরি হয় এই পর্যায়েই। তাই প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হোক কিংবা বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন-প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুকে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া।
কিন্তু প্রশ্ন হলো-কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠান নিয়ে এত ভয় বা আপত্তি কেন?
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়ে আসছে। শহর, উপজেলা এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। অনেক অভিভাবক নিজেদের পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানদের এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করছেন।
এটি যদি শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বাস্তব প্রতিযোগিতা তৈরি করে থাকে, তাহলে সেই প্রতিযোগিতাকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে শিক্ষার মান উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাষ্ট্রের বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পান। রাষ্ট্র তাদের ওপর বিপুল অর্থ ব্যয় করে। বিনিময়ে জাতির প্রত্যাশা-তারা নিষ্ঠা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কোমলমতি শিশুদের শিক্ষা দেবেন।
অন্যদিকে অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক সরাসরি সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা পান না। প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করেই তাদের কর্মসংস্থান ও পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা হয়। তারপরও অনেক কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে।
এখানেই আসল প্রশ্নটি সামনে আসে-
রাষ্ট্রের বিপুল অর্থায়ন, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যদি একটি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের সঙ্গে শিক্ষার মানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে, তাহলে সমস্যাটি কিন্ডারগার্টেনের, নাকি সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার?
প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কোনো প্রতিষ্ঠান ভালো করছে বলে তাকে বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা করার আগে বরং ভাবতে হবে-কেন অভিভাবকরা সেই প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন?
তারা কি নিয়মিত ক্লাসের কারণে সেখানে সন্তান পাঠাচ্ছেন? শিক্ষকদের তদারকি ভালো বলে? শৃঙ্খলা ও পরিচর্যার কারণে? নাকি সন্তানের পড়াশোনার প্রতি প্রতিষ্ঠানটির নজরদারি তুলনামূলক বেশি?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে সমস্যার প্রকৃত জায়গাটি চিহ্নিত করা সম্ভব।
অবশ্যই সব কিন্ডারগার্টেন আদর্শ নয়। কোথাও অনুমোদনের সমস্যা থাকতে পারে, কোথাও অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ থাকতে পারে, কোথাও শিক্ষকের যোগ্যতা বা শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করা আর গোটা কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংকুচিত বা বন্ধ করার চেষ্টা-এক বিষয় নয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত মান নির্ধারণ করা, নিয়ম-কানুন তৈরি করা এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। যে প্রতিষ্ঠান মান বজায় রাখবে, তাকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে; আর যে প্রতিষ্ঠান বজায় রাখতে পারবেনা, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই নিয়ম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর। তাদের সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বেতন-ভাতা যত বেশি, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার প্রত্যাশাও তত বেশি।
কেউ যদি সরকারি সুবিধা গ্রহণ করে দায়িত্বে অবহেলা করেন, তাহলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আবার কোনো কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষ যদি দায়িত্বে অবহেলা করেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
এখানে সরকারি শিক্ষক বনাম কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক-এমন কোনো বিভাজন কাম্য নয়।
বরং প্রয়োজন ‘কে ভালো শিক্ষা দিতে পারে’-এই ইতিবাচক প্রতিযোগিতা।
বিশ্বের বহু দেশেই সরকারি শিক্ষার পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সহাবস্থান দেখা যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতাও তাই সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো বিষয় নয়। তবে আমাদের দেশের আইন, নীতিমালা ও বাস্তবতার আলোকে একটি সুশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো থাকা জরুরি।
কিন্ডারগার্টেন বন্ধ করে দিলে কি শিক্ষার মান বাড়বে?
নাকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মান উন্নত করা, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি চালু করা, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যক্তিগত নজরদারি বাড়ালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে?
উত্তরটি খুব কঠিন নয়।
একটি প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো প্রতিযোগীকে বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং নিজেকে আরও ভালো করে তোলা।
তাই কিন্ডারগার্টেনকে ভয় নয়-প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা হোক।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আরও ভালো করুক। কিন্ডারগার্টেন আরও ভালো করুক। শিক্ষকরা আরও দক্ষ হোন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও দায়িত্বশীল হোক। আর এর সুফল পাক দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
কারণ শেষ পর্যন্ত লড়াইটা সরকারি বিদ্যালয় বনাম কিন্ডারগার্টেনের নয়।
লড়াইটা হওয়া উচিত অজ্ঞতা, দুর্বল শিক্ষা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে।
শিক্ষার্থী যেখানে ভালো শিক্ষা পাবে, অভিভাবক সেখানে সন্তান পাঠাবেন-এটাই স্বাভাবিক। সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে বরং শিক্ষার প্রতিটি স্তরে মান, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হোক।
কিন্ডারগার্টেন বন্ধ নয়-অনিয়ম বন্ধ হোক। প্রতিযোগিতা বন্ধ নয়-অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হোক। সরকারি বিদ্যালয় দুর্বল নয়-আরও শক্তিশালী হোক। আর সর্বোপরি, শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকুক শিক্ষার্থী।
এটাই হওয়া উচিত আমাদের সবার দাবি।
—মতামত প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের
Leave a Reply