মোঃ রাসেল সরকার;
গোপালগঞ্জের সাংবাদিক জিহাদ সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য ও অবৈধ অর্থ উপার্জন করতেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে বিভিন্ন খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র উন্মোচিত হচ্ছে। এর মধ্যে গণমাধ্যম সেক্টর এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় দলীয় প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নাম উঠে এসেছে। এই সিন্ডিকেটের মূল নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এবং আওয়ামীপন্থী ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)-এর সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুর রহমান জিহাদ এবং তাঁর সহযোগী হাফিজুর রহমান। গোপালগঞ্জের পরিচয়ের প্রভাব এবং দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা সরকারি দপ্তরগুলোতে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
গোপালগঞ্জের বাসিন্দা জাহিদুর রহমান জিহাদ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২০ সালের আওয়ামীপন্থী ডিইউজে কমিটিতে তিনি গোপালগঞ্জের ক্ষমতা ও প্রভাব দেখিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেন। তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের কোনো রাজনৈতিক পদের দায়িত্বে না থাকলেও সাংবাদিকতার আড়ালে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় ছিলেন। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে গণমাধ্যম এবং সাংবাদিক সংগঠনে দলীয় স্বার্থ রক্ষা করাই ছিল তাঁর মূল কাজ।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিটিভির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে জিহাদুর রহমান জিহাদ সরকারের দুর্নীতি, অনিয়ম, গুম, খুন, হত্যা এবং বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলার নির্যাতনকে সুকৌশলে আড়াল করেন। এর পরিবর্তে তিনি সরকারের কথিত উন্নয়ন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক প্রচারে যুক্ত ছিলেন। ২০২০ সালের ডিইউজে নির্বাচনে কুদ্দুস আফ্রাদ-সাজ্জাদ আলম খান তপু পরিষদের প্যানেল থেকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর, তিনি এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গণমাধ্যম সেক্টরে আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকদের সংগঠিত করতেন এবং বিরোধী মতাদর্শের সাংবাদিকদের কোণঠাসা করে রাখতেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা ও গণহত্যার মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলার এজাহারেও জিহাদুর রহমান জিহাদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এজাহার অনুযায়ী, তিনিসহ অন্যান্য অভিযুক্ত সাংবাদিকরা তৎকালীন সরকারের অবৈধ শাসন টিকিয়ে রাখতে, গুম-খুন ও গণহত্যার মাধ্যমে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করতে এবং সরকারের নীতিগত ষড়যন্ত্রে সরাসরি সহযোগিতা ও উসকানি দিয়েছিলেন। এত কিছুর পরও তিনি ও তাঁর সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জিহাদুর রহমান জিহাদ বিআইডব্লিউটিএসহ (BIWTA) বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে ব্যাপক প্রভাব খাটিয়েছিলেন। ডিইউজে-র শীর্ষ পদ, গোপালগঞ্জের বাড়ি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং বিটিভির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকের পরিচয়কে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় দেখানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন।
নওপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং বিদ্যুৎ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় তদবির বাণিজ্য, বদলি, পদোন্নতি ও ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন।
তৎকালীন শাসকদলের পন্থী প্রভাবশালী সাংবাদিক নেতা হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তারা তাঁর নির্দেশ বা অনুরোধ উপেক্ষা করার সাহস পেতেন না। সাধারণ সাংবাদিকরা যখন বিআইডব্লিউটিএ বা অন্য কোনো সরকারি দপ্তরের বড় বড় অনিয়ম, প্রকল্প লুটপাট কিংবা দুর্নীতি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে যেতেন, তখন তিনি তাতে সরাসরি বাধা দিতেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কুকর্মের সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদের ওপর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা হতো, যার ফলে অনেকেই ভয়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হতেন। কোনো কর্মকর্তা তাঁর কথামতো কাজ না করলে তাঁকে “সরকারবিরোধী” বা “বিএনপি-জামায়াতপন্থী” ট্যাগ দিয়ে চাকরিচ্যুত বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো।
এই ভয়ে দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারাও তাঁর অন্যায্য আবদার মেনে নিতে বাধ্য হতেন। জিহাদ একা নন, বরং তৎকালীন সরকারের সুবিধাভোগী অন্যান্য প্রভাবশালী সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট ও টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত হতো। বিআইডব্লিউটিএ ও বিদ্যুৎ বিভাগের মতো বড় বড় সরকারি সংস্থায় ঠিকাদারি কাজ বা টেন্ডার পাইয়ে দিতে জিহাদ ও তাঁর সহযোগী হাফিজুর রহমান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন। প্রতিটি প্রকল্পের অনুমোদনের বিপরীতে নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা কমিশন নিয়ে তারা কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেছেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের সুবিধাজনক স্থানে বদলি করা কিংবা অন্যায্য পদোন্নতি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হতো। চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তৎকালীন সরকারের ভয় দেখিয়ে তাদের কোণঠাসা করে রাখা হতো। সরকারি অধিদপ্তরের বড় বড় দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার বিনিময়ে তারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের “মাসোহারা” বা এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করতেন। টাকা দিতে অস্বীকার করলে চাকরিচ্যুতি বা বিরোধী দলীয় ট্যাগ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। জাহিদুর রহমান জিহাদ ও তাঁর সহযোগী হাফিজুর রহমান কেবল ফোনে তদবির সীমাবদ্ধ রাখেননি; তারা সশরীরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে গিয়ে ক্ষমতার প্রভাব নিশ্চিত করতেন।
বিআইডব্লিউটিএ-র মতো দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কক্ষে সরাসরি প্রবেশ করে তারা বসেন। এর উদ্দেশ্য ছিল কর্মকর্তাদের এটা বোঝানো যে, তাদের পেছনে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সমর্থন রয়েছে। কোনো প্রকল্পের টেন্ডার বা ফাইলের কাজ আটকে থাকলে তারা সরাসরি দপ্তরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট টেবিলের কর্মকর্তাকে বাধ্য করতেন ফাইলে স্বাক্ষর করতে। বিটিভির লোগো বা ডিইউজে-র পরিচয় ব্যবহার করে তারা দলবলসহ অফিসে প্রবেশ করায় সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে ভীতির পরিবেশ তৈরি হতো।
এছাড়া, তারা অফিসের ভেতরের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সাথে গোপন বৈঠকে বসে কোন টেন্ডার কার নামে বরাদ্দ হবে এবং সেখান থেকে কীভাবে কমিশন বণ্টন হবে, তা সামনাসামনি চূড়ান্ত করতেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে তাদের এই সরাসরি যাতায়াত ও দাপটের চিত্র ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়। সরকারের পটপরিবর্তনের পর এই সিন্ডিকেটের রাজনৈতিক দাপট দৃশ্যত বন্ধ হলেও, ভিন্ন কৌশলে তাদের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। জিহাদসহ তার সহযোগীরা আইনি জটিলতা ও মামলার মুখে পড়ায় আগের মতো প্রকাশ্যে দপ্তরে প্রভাব খাটাতে পারছেন না। তবে আড়ালে থেকে সিন্ডিকেটের তৎপরতা সচল রাখার অপচেষ্টা চলছে।
অতীতে চরম আওয়ামীপন্থী পরিচয় দিয়ে দাপট দেখানো ব্যক্তিরা এখন নিজেদের বাঁচানোর জন্য রাতারাতি নিরপেক্ষ বা ভুক্তভোগী সাজার অভিনয় করছেন, যাতে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে বিআইডব্লিউটিএসহ বিভিন্ন দপ্তরে তদবির বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া যায়। অতীতে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই এখনও নিজ নিজ পদে বহাল আছেন। এই ভেতরের দোসরদের মাধ্যমে জিহাদ ও হাফিজুরের সিন্ডিকেট পেছনের দরজা দিয়ে কাজ হাসিল, ফাইল ছাড়ানো বা অভ্যন্তরীণ তথ্য পাচারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
সরাসরি নিজেদের নামে কাজ নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সিন্ডিকেটের সদস্যরা এখন ভিন্ন ব্যক্তির নাম বা ভিন্ন লাইসেন্স (বেনামি প্রতিষ্ঠান) ব্যবহার করে সরকারি টেন্ডারে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করছে। এভাবে তারা আড়ালে থেকে অর্থ উপার্জন সচল রেখেছে।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর হত্যা মামলাসহ দুর্নীতির নানা অভিযোগের তদন্ত শুরু হওয়ায় এবং আইনি গ্রেপ্তার বা গণরোষের ভয়ে তারা বেশিরভাগ সময় আত্মগোপনে বা সতর্ক অবস্থায় থেকে ছদ্মবেশে কাজ চালানোর চেষ্টা করছে। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে তারা এখনও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং দপ্তরের ভেতরে থাকা তাদের দোসরদের দ্রুত চিহ্নিত করে অপসারণ করা না হলে, এই ধরনের সিন্ডিকেটগুলো গোপনে পুনরায় শক্তিশালী হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকেই যায়।
Leave a Reply