মোঃ রাসেল সরকার;
ঢাকার অপরাধ জগতের এক অন্ধকার ও আতঙ্কের নাম তানিম রেজা ওরফে বাপ্পি (৪৬)। একসময় মতিঝিল, সবুজবাগসহ রাজধানীর একটি বিশাল অংশে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের বুকে কাঁপন ধরাত এই নাম। আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের প্রধান সহযোগী বা ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত এই বাপ্পি মূলত পুরো ঢাকার অপরাধ সাম্রাজ্যের অন্যতম শীর্ষ ও দুর্ধর্ষ শুটার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সুব্রত বাইনের হাত ধরেই অপরাধ জগতের শীর্ষস্থানে আরোহণের পথ সুগম হয় বাপ্পির। সুব্রত বাইনের নিয়ন্ত্রণাধীন আন্ডারওয়ার্ল্ডের মূল অবৈধ অস্ত্রভাণ্ডার ছিল বাপ্পির হাতের মুঠোয়।
এই বিশাল ও আধুনিক অস্ত্রের লাইনে সরাসরি অ্যাক্সেস থাকায় বাপ্পি দ্রুতই নিজেকে একজন প্রভাবশালী শুটার ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বর্তমানের এই শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তার সিন্ডিকেটের অপরাধের ধরন অত্যন্ত আধুনিক ও সুপরিকল্পিত। সনাতন পদ্ধতির বাইরে গিয়ে তারা মূলত বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ কলের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তবে বাপ্পি সিন্ডিকেটের আয়ের অন্যতম প্রধান ও স্থায়ী উৎস হলো রাজধানীর একটি বিশাল বেল্টের পরিবহন সেক্টর। বাস কাউন্টারগুলো থেকে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে এই চক্র।
মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরাপুল, নয়া পল্টন, মালিবাগ, মগবাজার, খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা, মানিকনগর, টিটিপাড়া এবং গোলাপবাগ এলাকাগুলো নিয়ে গঠিত বিশাল বেল্টে ছোট-বড় ও লোকাল মিলিয়ে আনুমানিক আড়াই শ থেকে তিন শ’রও বেশি সচল বাস কাউন্টার রয়েছে। সায়দাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল জোনের বর্ধিত অংশ হিসেবে এই পুরো রুটে কাউন্টারের সংখ্যা অনেক বেশি। অবস্থান ও গুরুত্ব অনুযায়ী এই বাস কাউন্টারগুলোকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়, আরামবাগ, ফকিরাপুল, নয়া পল্টন ও মতিঝিল এলাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, নোয়াখালী, খুলনা ও বরিশাল রুটের প্রধান লাক্সারি কাউন্টার জোন এটি।
শুধুমাত্র এই জোনের ভেতরেই এক শ কুড়ি থেকে এক শ পঞ্চাশটির মতো কাউন্টার রয়েছে। এর মধ্যে আরামবাগ ও ফকিরাপুলে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, ইউনিক সার্ভিস, এনা ট্রান্সপোর্ট, সিল্কলাইন, সেন্টমার্টিন ট্রাভেলস ও সৌদিয়া পরিবহনের একাধিক বড় কাউন্টার রয়েছে। এছাড়া পল্টন মোড় এবং মতিঝিল সার্কুলার রোডের আশেপাশে সোহাগ পরিবহন, গ্রীন লাইন, টিআর ট্রাভেলস এবং দেশ ট্রাভেলসের মতো প্রিমিয়াম এসি বাস সার্ভিসের মূল কাউন্টারগুলো অবস্থিত।
টিটিপাড়া, গোলাপবাগ, মানিকনগর ও মুগদা এলাকায় সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের সীমানা ঘেঁষে আনুমানিক ৮০ থেকে ১০০টির মতো বাস কাউন্টার রয়েছে। টিটিপাড়া ও মানিকনগরে মূলত মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে খুলনা, বরিশাল, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও ফরিদপুর রুটের বাসের অসংখ্য কাউন্টার রয়েছে। আর গোলাপবাগ ও মুগদায় চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন নন-এসি এবং লোকাল গেইটলক বাসের কাউন্টার ও বুকিং পয়েন্ট রয়েছে।
মালিবাগ, মগবাজার, খিলগাঁও ও সবুজবাগে ঢাকা শহরের অভ্যন্তরীণ রুট এবং গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জ রুটের বাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জোনে আনুমানিক চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটির মতো লোকাল ও টিকিট কাউন্টার রয়েছে। মালিবাগ ও মগবাজারে অনাবিল, আকাশ, রাইদা এবং গাজীপুর পরিবহনের টিকিট চেকিং ও কাউন্টার টিকিট বিক্রির বুথ রয়েছে। এছাড়া খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে ও বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির সংলগ্ন রাস্তায় মিডলাইন, বাহন ও লাব্বাইক পরিবহনের মতো সিটি বাসগুলোর স্টপেজ ও টিকিট কাউন্টার রয়েছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী শুটার বাপ্পির সিন্ডিকেট এই আড়াই শ থেকে তিন শ বাস কাউন্টার থেকে মূলত দুই ভাগে চাঁদা আদায় করে থাকে, দৈনিক ১ হাজার টাকা এবং মাসিক ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। দৈনিক মোট আদায়, আড়াই লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা। মাসিক মোট আদায় (৩০ দিন), পঁচাত্তর লাখ থেকে ৯০ লাখ টাকা। বাৎসরিক মোট আদায় (৩৬৫ দিন), ৯ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
ফিক্সড মাসিক কাউন্টার (প্রতি মাসে ১ থেকে ২ লাখ টাকা), সর্বনিম্ন হিসাব (আড়াই শ কাউন্টার ধরে), মাসে ১ লাখ টাকা করে হলে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ২ লাখ টাকা করে হলে ৫ কোটি টাকা। সর্বোচ্চ হিসাব (তিন শ কাউন্টার ধরে), মাসে ১ লাখ টাকা করে হলে ৩ কোটি টাকা এবং ২ লাখ টাকা করে হলে ৬ কোটি টাকা। ফলে বছর শেষে শুধুমাত্র মাসিক চুক্তি থেকেই আসে ৩০ কোটি থেকে ৭২ কোটি টাকা। দৈনিক ও মাসিক—এই দুটি ভিন্ন ধারার চাঁদা আদায়ের হিসাবকে একসঙ্গে সমন্বয় করলে বাপ্পি সিন্ডিকেটের মোট চাঁদাবাজির পরিমাণ দাঁড়ায় বিশাল অঙ্কে। মাসিক ভিত্তিতে সর্বমোট আদায়, সর্বনিম্ন মোট (আড়াই শ কাউন্টার), পঁচাত্তর লাখ (দৈনিক) + ২ কোটি ৫০ লাখ (মাসিক) = ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
সর্বোচ্চ মোট (তিন শ কাউন্টার), ৯০ লাখ (দৈনিক) + ৬ কোটি (মাসিক) = ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বাৎসরিক ভিত্তিতে সর্বমোট আদায় (১২ মাস), সর্বনিম্ন বাৎসরিক মোট, ৯ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার + ৩০ কোটি = ৩৯ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ বাৎসরিক মোট, ১০ কোটি ৯০ লাখ + ৭২ কোটি = ৮২ কোটি ৯০ লাখ টাকা (সামগ্রికভাবে ৮২.৯৫ কোটি টাকা পর্যন্ত)। দৈনিক চাঁদা (১,০০০ টাকা)২.৫ লাখ — ৩ লাখ টাকা৭৫ লাখ — ৯০ লাখ টাকা৯.১২৫ কোটি — ১০.৯৫ কোটি টাকা
ফিক্সড মাসিক চাঁদা (১-২ লাখ টাকা)৩.৩৩ লাখ — ২০ লাখ টাকা২.৫ কোটি — ৬ কোটি টাকা৩০ কোটি — ৭২ কোটি টাকা। সমন্বিত মোট হিসাব৫.৮৩ লাখ — ২৩ লাখ টাকা৩.২৫ কোটি — ৬.৯০ কোটি টাকা৩৯.১২৫ কোটি — ৮২.৯৫ কোটি টাকা। দৈনিক এবং ফিক্সড মাসিক চাঁদা—এই দুটি খাত মিলিয়ে বাপ্পি সিন্ডিকেটের সর্বমোট চাঁদাবাজির পরিমাণ প্রতি মাসে ৩ কোটি ২৫ লাখ থেকে ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং বছর শেষে তা দাঁড়ায় প্রায় ৩৯.১২৫ কোটি থেকে ৮২.৯৫ কোটি টাকা পর্যন্ত। এই বিশাল চাঁদার অর্থ কি শুধু বাপ্পি সিন্ডিকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
রাজধানীর মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরাপুল, নয়াপল্টন, মালিবাগ, মগবাজার, খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা, মানিকনগর, টিটিপাড়া এবং গোলাপবাগ এলাকায় অবস্থিত প্রতিটা বাস কাউন্টার সূত্রে এই তথ্য জানা যায়। অনেকেই সন্ত্রাসীদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। সাধারণ সময়ের এই বিশাল অঙ্কের বাইরেও ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা বা পূজার মতো বড় উৎসবগুলোতে এই চাঁদার পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। উৎসবের মৌসুমে কাউন্টার প্রতি এককালীন বড় অঙ্কের বখশিস বা ঈদ বোনাস দাবি করা হয়।
পরিবহন মালিক ও কাউন্টার সংশ্লিষ্টরা বাপ্পি সিন্ডিকেটের এই কোটি কোটি টাকার চাঁdan চাপ সামলাতে বাধ্য হয়ে টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেন। ফলে এই অননুমোদিত ও অবৈধ লেনদেনের চূড়ান্ত খেসারত দিতে হয় সাধারণ যাত্রীদের, যাদেরকে যাতায়াতে প্রতিনিয়ত বাড়তি খরচের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বাপ্পি ও তার সক্রিয় সিন্ডিকেট এখনো এই বিশাল জোনের পরিবহন খাতকে জিম্মি করে রেখেছে, যা পুরো রাজধানী তথা দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি।
বিঃদ্রঃ শীর্ষ সন্ত্রাসী শুটার বাপ্পির অন্যান্য সেক্টর থেকে চাঁদার আয়-ব্যয় নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন পরবর্তী সময়ে তুলে ধরা হবে।
Leave a Reply