শেখ মাহতাব হোসেন ডুমুরিয়া (খুলনা):
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ১২নং রংপুর ইউনিয়নে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়নাধীন একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বটবেড়া এলাকার মিলন মন্ডলের বাড়ি থেকে গোবিন্দ রায়ের বাড়ি পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুনঃনির্মাণ ও প্যালাসাইডিংয়ের জন্য মোট ২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) রমেশ চন্দ্র বৈরাগী।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের এই প্রকল্পে সরকারি নিয়ম ও শিডিউলের তোয়াক্কাই করা হয়নি। ৬ ফুট প্রস্থের রাস্তা করার সরকারি নকশা থাকলেও বাস্তবে তা ৫ ফুটেরও কম রাখা হয়েছে। রাস্তায় নতুন ইটের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে পুরাতন ও ভাঙাচোরা ইট। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হলো, ইটের নিচে কোনো বালুর স্তর দেওয়া হয়নি এবং পাইলিংয়ের কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। ফলে বর্ষা বা সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাটি ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের সাক্ষাৎকার: কী বলছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা?
প্রকল্পের অনিয়ম, স্থানীয়দের ক্ষোভ এবং প্রশাসনের বক্তব্য জানতে ঘটনার গভীরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলা হয়েছে। সাক্ষাৎকারগুলো নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:
স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দা ও এলাকাবাসী
তুষার মন্ডল ও অজিত মন্ডল (স্থানীয় বাসিন্দা):
“সরকারি টাকায় রাস্তা হচ্ছে শুনো আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু কাজ শুরু হতেই দেখি সব দুই নম্বরী। নতুন ইটের জায়গায় সব ভাঙা আর পুরনো ইট এনে বিছানো হয়েছে। নিচে কোনো বালু দেওয়া হয়নি। পাইলিংয়ে যে কাঠ আর বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে, তা এতোই নিম্নমানের যে কয়েকটা দিন গেলেই সব ভেঙে নদীতে বা বিলে চলে যাবে। আমাদের করের টাকার এভাবে শ্রাদ্ধ করা হচ্ছে।”
মনিতোষ মন্ডল (স্থানীয় বাসিন্দা, যার সাথে মেম্বার চড়াও হয়েছেন):
“আমি যখন মেম্বারকে জিজ্ঞেস করলাম—ইটের নিচে বালু দিচ্ছেন না কেন? রাস্তার পাশ কেন ছোট করছেন? তখন রমেশ মেম্বার আমার ওপর চটে যান। অত্যন্ত উদ্ধত গলায় আমাকে বলেন, ‘তুমি কি ইঞ্জিনিয়ার হয়েছ? তোমাকে কেন কাজের হিসাব দিতে হবে?’ সরকারি কাজের হিসাব চাওয়া কি আমাদের অপরাধ? আমরা এই দুর্নীতির বিচার চাই।”
অভিযুক্ত প্রকল্প সভাপতি ও ইউপি সদস্য
রমেশ চন্দ্র বৈরাগী (সভাপতি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও ইউপি সদস্য):
(কাজের ত্রুটির কথা আংশিক স্বীকার করে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে) “কাজে সামান্য কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে, এটা আমি স্বীকার করছি। তবে যেভাবে অভিযোগ করা হচ্ছে, ততটা খারাপ কাজ হয়নি। আর মনিতোষের সাথে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, আমি ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ ব্যবহার করিনি। কাজটা তো এখনো শেষ হয়নি, বাকিটুকু নিয়ম মেনেই করা হবে।”
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান
অধ্যক্ষ সমরেশ মন্ডল (চেয়ারম্যান, ১২নং রংপুর ইউনিয়ন পরিষদ):
“বটবেড়া এলাকার ওই সড়কটির কাজের অনিয়মের বিষয়টি এলাকার লোকজন আমাকে জানিয়েছে। কাজের মান যে খারাপ হয়েছে, তা আমার নজরেও এসেছে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য রমেশ বৈরাগী নির্দেশ দিয়েছি যেন দ্রুত ত্রুটিগুলো সংশোধন করে সরকারি শিডিউল অনুযায়ী কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। জনস্বার্থে কোনো আপস করা হবে না।”
উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা
রফিকুল ইসলাম (উপ-সহকারী কর্মকর্তা, ডুমুরিয়া উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়):
“প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। আপনাদের জানিয়ে রাখি, এই প্রকল্পের পুরো বিল এখনো ছাড় করা হয়নি; কেবল প্রথম কিস্তির টাকা দেওয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। তদন্তে যদি শিডিউল বহির্ভূত বা নিম্নমানের কাজের প্রমাণ মেলে, তবে প্রকল্পের বাকি চূড়ান্ত বিল সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি: শুধু বিল স্থগিত নয়, চাই কঠোর শাস্তি প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিল স্থগিতের আশ্বাস দেওয়া হলেও এতে সন্তুষ্ট নন ডুমুরিয়ার সচেতন মহল। স্থানীয় বাসিন্দা সাধন বিশ্বাস ও ইতি মন্ডলসহ অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কাজ শেষ হওয়ার পর তা জোড়াতালি দিয়ে সংশোধনের সুযোগ নেই। তারা শুধু বিল স্থগিত নয়, বরং সরকারি অর্থ আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগে তদন্ত সাপেক্ষে দোষী ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে সড়কটি পুনরায় সঠিক মান ও নকশা বজায় রেখে নতুন করে নির্মাণের দাবি তুলেছেন তারা।
প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ
গ্রামীণ জনপদের যাতায়াত ব্যবস্থা সচল রাখতে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় এই প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা ও নিয়মিত তদারকির অভাবে এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পকেট ভারী করার মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে। ডুমুরিয়ার এই ঘটনাটি গ্রামীণ অবকাঠামো খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের লুটপাট বন্ধে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত, কঠোর ও নিরপেক্ষ মনিটরিং এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply