নুরে আলম শাহ, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ও চিলারং ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে গেছে শুক নদী। প্রতিবছরের মতো এবারও এই নদীর ‘বুড়ির বাঁধ’ এলাকায় নেমেছে হাজারো মানুষের মাছ শিকারের ঢল। শীতের আগমনী বার্তায় বাঁধের পানি ছেড়ে দেওয়ার পরপরই সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় মাছ শিকার। বছরের পর বছর ধরে শীতের শুরুতে বুড়ির বাঁধ প্রাঙ্গণে এভাবেই পালিত হয়ে আসছে স্থানীয়দের এই প্রাণের মিলনমেলা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে বুড়ির বাঁধের পাঁচটি জলকপাট (স্লুইস গেট) খুলে দেওয়া হয়। বাঁধের পানি কমে যাওয়ার পর শনিবার ভোর থেকেই আশেপাশের কয়েকটি গ্রামসহ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষ নেমে পড়েন মাছ শিকারে। তবে আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার প্রত্যাশিত মাছ না পাওয়ায় কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাজারো নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ ও শিশু উৎসবে মেতে উঠেছেন। তাদের পরনে কাঁদা-পানি, আর হাতে নানা রকমের মাছ ধরার সরঞ্জাম—পলো, খঁচা, লাফিজাল, ফিকাজাল, কারেন্ট জাল ও রিং জাল। যাদের কাছে কোনো সরঞ্জাম নেই, তারাও উৎসবের আনন্দে খালি হাতে কাঁদা পানিতেই নেমে পড়েছেন মাছের খোঁজে।
ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের বাসিন্দা মিতুল হাসান বলেন, “প্রতিবছরই আমি এখানে মাছ ধরতে আসি। বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে মাছ ধরার আনন্দই আলাদা, পুরো এলাকা যেন মেলায় পরিণত হয়। তবে এবার দেশীয় মাছ আগের চেয়ে বেশ কম। অসাধু কিছু ব্যবসায়ীদের পেতে রাখা রিং জালের কারণে আমাদের মতো সাধারণ শৌখিন মৎস্যশিকারিরা মাছ তুলনামূলক কম পাচ্ছেন।”
মাছ ধরতে আসা স্থানীয় মোজাম্মেল হক জানান, “আনন্দ ও শখের বসেই ভোরে এখানে এসেছি। সকাল নয়টা পর্যন্ত বাইম, পুঁটি ও টেংরাসহ প্রায় দুই কেজি মাছ পেয়েছি। পরিবার নিয়ে এই মাছ খাওয়ার আনন্দই আলাদা।”
অন্যান্য জেলেরা জানান, জলকপাট খোলার পর টানা কয়েকদিন মাছ ধরা চলে। তবে প্রথম দিনেই মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে। বিগত দুই-তিন বছর ধরে নদী ও বাঁধে মাছের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। রিং ও কারেন্ট জালের বেপরোয়া ব্যবহারের কারণেই মূলত দেশীয় প্রজাতির মাছ কমে যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাঊবো) ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান জানান, ১৯৫১-৫২ সালের দিকে এ অঞ্চলের শুষ্ক মৌসুমে কৃষি জমিতে সেচ সুবিধার জন্য শুক নদীতে এই জলকপাটটি নির্মাণ করা হয়, যা পরবর্তীতে ‘বুড়ির বাঁধ’ নামে পরিচিতি পায়। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উঁচু জমিতে সেচ দেওয়ার সুবিধার্থে এখানে পানি আটকে রাখা হয় এবং বাঁধের সামনের মৎস্য অভয়াশ্রমে জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের পোনা ছাড়া হয়। এগুলোর দেখভাল করে স্থানীয় আকচা ও চিলারং ইউনিয়ন পরিষদ। পরবর্তীতে শীতের শুরুতে সেচ মৌসুম শেষ হলে পানি ছেড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য মাছ শিকার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
Leave a Reply