এম রাসেল সরকার:
রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল করে তুলছে পার্কিং অব্যবস্থাপনা আর অবৈধ কাউন্টার। ঢাকার রাস্তাঘাটে অসহনীয় যাটজট দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও সমাধান মেলে না। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে যানজট নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই বিভিন্ন নির্দেশনা দিলেও বাস্তবায়ন এখনও সুদূরপরাহত। রাজধানীর যে যাটজটে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থেকে যে বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে তার প্রধান দুটি কারণ মূলত- যত্রতত্র পার্কিং করে যাত্রী ওঠানামা এবং যেখানে-সেখানে গড়ে ওঠা অবৈধ কাউন্টার।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও বাসিন্দাদের অভিযোগে দেখা যায়, যেখানে যেখানে স্থান মেলে, চালকরা সেখানে গাড়ি রেখে দিচ্ছেন- ফুটপাত, গলি, প্রধান সড়ক- সবই এখন পার্কিংয়ের শিকার। শুধু প্রাইভেটকারই নয়, বাস, ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যানবাহনও নিয়মবহির্ভূতভাবে সারি সারি পার্কিং করে রাখছে; ফলে দিনের অধিকাংশ সময়েই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো জ্যামে আটকে পড়ে।
মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল এই বিশৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। টার্মিনালের ধারণক্ষমতা আনুমানিক ৩৫০টি বাস রাখার জন্য নির্ধারিত হলেও বিআরটিএ কর্তৃক বিভিন্ন রুটে হাজারেরও বেশি বাসকে অনুমোদন দেওয়ার ফলে বাস্তবে প্রতিদিন টার্মিনালের আশপাশে শত শত বাস সড়কে দাঁড়িয়ে থাকে। টার্মিনালের ভেতরে স্থান না পাওয়ায় চালকরা রাস্তায় গাড়ি রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন; এতে মহাখালী থেকে বনানী পর্যন্ত প্রধান সড়কগুলো প্রায় সারাদিনই জ্যামে ভরে থাকে। বাস চালকরা বলছেন, টার্মিনালে ঢুকতে না পারায় বাধ্য হয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হয়; আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বাসই মূলত যানজটের কারণ।
এদিকে, ফুটপাত এখন আর পথচারীদের জন্যই নয়; প্রাইভেটকারের পার্কিংও ফুটপাত দখল করে ফেলেছে। যাত্রাবাড়ী গুলিস্তান, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মতিঝিল- এসব এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফুটপাত ও গলিতে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে পথচারী, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। বনানীর একজন বলেন, পুরো একটা লেন দখল করে সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে; বাকি লেনে গাদাগাদি করে গাড়ি চলতে হয়, দিনভর জ্যাম লেগেই থাকে।
ডেমরা যাত্রাবাড়ী মতিঝিল সায়দাবাদ অলিগলি এলাকায়ও একই চিত্র- অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে গলিগুলো প্রায়ই বন্ধ হয়ে পড়ে। পার্কিং নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন- ঢাকা দক্ষিণ (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর (ডিএনসিসি)- এর ওপর থাকলেও বাস্তবে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট।
ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ জানায়, নগরে প্রায় ৩০টির মতো নির্ধারিত পার্কিং জোন রয়েছে এবং আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে; তবু জমির স্বল্পতা ও বাজেট সংকট বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বলেন, সিটি করপোরেশন যে পরিকল্পনাই নিক, সেখানে পার্কিং সংযুক্ত রাখা হয় যাতে সড়কের ওপর যানবাহন পার্কিং না করতে পারে। বাস্তবে যদিও ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ট্রাফিক পুলিশের অভিযান হয়, তা অনেক সময় সাময়িক এবং পুনরাবৃত্তি রোধে অপ্রতুল।
মতিঝিলের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ডিএসসিসি কিছু পার্কিং ব্যবস্থা করেছে- সিটি সেন্টারে প্রায় পাঁচ শতাধিক এবং দিলকুশা ও বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশেও আরও পাঁচ শতাধিক পার্কিং স্পেস থাকলেও আশপাশের হাজার হাজার গাড়ি সড়ক ও ফুটপাতে পার্কিং করে রাখায় প্রধান সড়কগুলো দিনের অধিকাংশ সময়ই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গুলশান‑বাড়িধারা‑বনানী অঞ্চলে ডিএনসিসির পার্কিং সুবিধা সীমিত; আবাসিক ভবনগুলোর অতিথি পার্কিংয়ের নির্দেশ থাকলেও বাইরে কোথায় পার্কিং করা যাবে- এমন কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই। ফলে অতিথি বা বাইরের যানবাহনগুলো সড়কেই দাঁড়ায়।
এদিকে, আইনগত দিক থেকেও পরিস্থিতি জটিল। ১৯৮৩ সালের মোটরযান আইন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক ও পার্কিং লঙ্ঘনের জন্য জরিমানা ধার্য আছে- প্রকাশ্য সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে ৫০০ টাকা জরিমানা, নিরাপত্তাহীন অবস্থায় গাড়ি চালালে ২৫০ থেকে ১০০০ টাকা জরিমানা ইত্যাদি। তবু বাস্তবে জরিমানা আর মামলা প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নেই; কোথাও পুলিশ কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছে, আবার কোথাও কোনো নজরই নেই- এই অনিয়মই চালকদের উৎসাহ দিচ্ছে। অনেক সময় অভিযানের পরে গাড়ি সরানো হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার একই অবস্থা ফিরে আসে।
রাজধানীর যত্রতত্র গড়ে উঠেছে দূরপাল্লার বাসের শত শত কাউন্টার। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের পাশাপাশি ফুটপাত, এমনকি ব্যস্ত সড়কের পাশে এসব কাউন্টার পরিচালিত হচ্ছে। ফলে যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করছেন চালকরা। এতে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সড়কগুলোতে তীব্র যানজট বাঁধছে। একই সঙ্গে বাসের জন্য ফুটপাত বা সড়কের ধারে মালামাল নিয়ে অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা নিজে যেমন রোদ-বৃষ্টিতে ভোগান্তিতে পড়ছেন, তেমনি পথচারীরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এ অব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বড় বিপত্তি সৃষ্টি করছে প্রগতি সরণিতে।
এছাড়া যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ধোলাইপাড়, জুরাইন, কমলাপুর, আরামবাগ, ফকিরাপুল,পান্থপথ, কলাবাগান, শ্যামলী, গাবতলী, উত্তরা ও আবদুল্লাহপুরে অনেক বাস কাউন্টার গড়ে উঠেছে। যার অধিকাংশের অনুমোদন নেই। সেখানে রাস্তার পাশে বা মোড়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এতে সড়কের একাংশ কার্যত দখল হয়ে যায়। ফলে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত এবং দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অফিস সময় ও সন্ধ্যায় সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতিদিনের যানজট ও জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ বাস কাউন্টারগুলো।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বসানো এসব কাউন্টার কার্যত রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল করে তুলছে। অথচ ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচলের জন্য নির্ধারিত টার্মিনাল- সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া রয়েছে। কিন্তু এসব টার্মিনাল ব্যবহার না করে পরিবহন মালিকরা শহরের ভেতরে সুবিধাজনক জায়গায় কাউন্টার স্থাপন করছেন, যাতে যাত্রী সংগ্রহ সহজ হয়। এতে তাদের ব্যবসায়িক লাভ বাড়লেও নগরবাসীকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যদিও সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের আশপাশ থেকে প্রায় আড়াইশ অবৈধ কাউন্টার অপসারণে টানা অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) চিত্র পাল্টায়নি সে আগের রূপেই রয়ে গেছে। কিন্তু এর বাইরে অন্য এলাকার অবৈধ কাউন্টার উচ্ছেদে তাদের কোনো পরিকল্পনা জানা যায়নি। অন্যদিকে, প্রগতি সরণিসহ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার অবৈধ কাউন্টার অপসারণেও কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সমাধান হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগর পরিকল্পনায় পার্কিং জোন নির্ধারণ করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে; ভবন নির্মাণের সময় পার্কিং নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ ও তদারকি করতে হবে; ট্রাফিক পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সমন্বিত অভিযান ও নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যকর করতে হবে যাতে জরিমানা ও মামলা পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর হয়। এছাড়া মহাখালী টার্মিনালের মতো কেন্দ্রীয় পরিবহন হাবগুলোর জন্য বাস্তবসম্মত রুট‑পারমিট নির্ধারণ ও টার্মিনালের অবকাঠামো সমপ্রসারণ জরুরি; বিআরটিএকে টার্মিনালের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে রুট অনুমোদন দিতে হবে।
এদিকে সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে বাস ছেড়ে যাওয়া নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং যানজট নিরসনে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালকে মূল নকশা অনুযায়ী আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। এখন থেকে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন কাউন্টার উচ্ছেদ করে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।
মঙ্গলবার (১২ মে) নগর ভবনে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সংক্রান্ত এক সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়। ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবহন নেতা অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
সভার মূল সিদ্ধান্তসমূহ- কাউন্টার পুনর্বিন্যাস, টার্মিনালের অভ্যন্তরে থাকা ৬টি ব্লকের ১১০টি টিকিট কাউন্টার ন্যায্যতার ভিত্তিতে পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ কাজে পরিবহন মালিক সমিতি ডিএসসিসি ও ট্রাফিক পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, টার্মিনালের বাইরে বা আশপাশে গড়ে ওঠা সকল অনুমোদনহীন কাউন্টার এবং টার্মিনালের অভ্যন্তরের অবৈধ দোকানপাট দ্রুত উচ্ছেদ করা হবে।
অবকাঠামো উন্নয়ন, মূল নকশা অনুযায়ী বাস চলাচলে ফ্লাইওভারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে অপ্রয়োজনীয় উন্মুক্ত স্থানে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হবে। এছাড়া টার্মিনালের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিত্যক্ত বাসের অবশিষ্টাংশ সরিয়ে ফেলা হবে। যাত্রীদের সুবিধার্থে টার্মিনালে একটি আধুনিক ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার, সুপরিসর বিশ্রামাগার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন টয়লেট এবং নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ফাঁড়ি ও নিয়ন সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রশাসক মোঃ আবদুস সালাম বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাস টার্মিনালের পরিপূর্ণ ব্যবহারের বিকল্প নেই। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে সায়েদাবাদকে একটি আধুনিক ও ব্যবহার উপযোগী টার্মিনাল হিসেবে গড়ে তোলা হবে।” তিনি এ বিষয়ে সকল অংশীজনের সহায়তা প্রত্যাশা করেন। সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিমুল বিশ্বাস বলেন “বাসগুলো টার্মিনালের ভেতর থেকে চলাচল করলে একদিকে যেমন যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে ঈদসহ বিশেষ সময়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। সরকার ও মালিক-শ্রমিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমরা কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে চাই। সভায় ডিএসসিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply