এম রাসেল সরকার:
যেকোনো আদর্শিক বা রাজনৈতিক সংগঠনের মূল ভিত্তি হলো তার তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা। একটি গাছ যেমন শিকড় ছাড়া দাঁড়াতে পারে না, তেমনি নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছাড়া রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দেখা যাচ্ছে, কর্মীদের ব্যবহার করা হচ্ছে কেবল সিঁড়ি হিসেবে, যেখানে নেতাদের উত্থান ঘটলেও কর্মীরা থেকে যাচ্ছেন অন্ধকারে।
রাজনীতিতে আমরা দেখি, কর্মীদের বিভিন্ন কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সামনের সারিতে রাখা হয়। যেমন, পোস্টার ও ব্যানার লাগানো এবং লিফলেট বিতরণ। হরতাল ও আন্দোলন সফল করা। নির্বাচনের সময় নির্ঘুম প্রচারণা এবং ভোটকেন্দ্র পাহাড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, কর্মীরা যখন নেতার জন্য জেল-জুলুম সহ্য করেন বা রাজপথে ঘাম ঝরান, তখন তারা নেতার কাছে প্রিয় থাকেন। কিন্তু যখনই তাদের ব্যক্তিগত বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্ন আসে, তখনই শুরু হয় অবহেলা।
একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর প্রতি নেতাদের আচরণের কিছু নেতিবাচক দিক বর্তমানে প্রকট হয়ে উঠেছে, কর্মীকে দিয়ে রাজনৈতিক কাজ করাতে দ্বিধা না থাকলেও, তাকে ব্যবসায়িক অংশীদার করতে বা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে নেতাদের সংকোচবোধ হয়।
অনেক ক্ষেত্রে কর্মীর পোশাক বা বেশভূষা আভিজাত্যপূর্ণ না হওয়ায় তাকে দাওয়াত দিতে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে পাশে বসাতে নেতারা হীনম্মন্যতায় ভোগেন। সৎ ও ত্যাগী কর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেতার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলেও, সুবিধাবাদী চাটুকারেরা দ্রুত সুযোগ লুফে নেয়। রাজপথের লড়াকু সৈনিক যখন মৃত্যুবরণ করেন বা বিপদে পড়েন, অনেক সময় নেতারা নিজেদের স্বার্থে তাদের অস্বীকার করেন। লাশ নিয়ে রাজনীতি হলেও পরিবারের খোঁজ নেওয়ার লোক থাকে না। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বড় বড় নেতারা অনেক সময় জনসম্মুখে লাঞ্ছিত হয়েছেন, কিন্তু আদর্শবান কর্মীরা সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পান। কর্মীরা বেইমানি জানে না, তারা শুধু দিতে জানে।
তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেতারা ক্ষমতার চেয়ারে বসেন, অথচ সেই কর্মীদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন, ”পানি ছাড়া যেমন মাছ বাঁচে না, শিকড় ছাড়া যেমন গাছ বাঁচে না; তেমনি কর্মী ছাড়া দল বাঁচে না এবং দল ছাড়া নেতার কোনো অস্তিত্ব থাকে না।”
রাজনীতিকে প্রকৃত জনকল্যাণে রূপান্তর করতে হলে নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। কর্মীদের কেবল ‘ব্যবহারযোগ্য বস্তু’ হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। দলীয় পদ দেওয়ার পাশাপাশি কর্মীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিতে হবে। একজন কর্মী যখন আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকবেন, তখনই তিনি স্বচ্ছভাবে রাজনীতি ও জনগণের সেবা করতে পারবেন। চাটুকারিতা পরিহার করে ত্যাগী ও সৎ কর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, কর্মীই দলের প্রাণ। কর্মীদের ভালো-মন্দের খবর রাখা এবং তাদের সম্মান রক্ষা করা প্রতিটি নেতার নৈতিক দায়িত্ব। কর্মীরা বাঁচলে দল বাঁচবে, আর দল বাঁচলে রাজনীতি টিকে থাকবে।
🟰স্লোগান বনাম স্বাবলম্বন—বঞ্চনা ও অবক্ষয়ের নেপথ্য কারণ?
দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক কর্মীরা প্রায়শই মামলা-হামলা, চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক নিগ্রহের শিকার হন। এই দীর্ঘস্থায়ী অভাব ও বঞ্চনা তাদের মধ্যে এক ধরনের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। ফলে দল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের মধ্যে “এখনই সময় উসুল করে নেওয়ার” একটি নেতিবাচক মানসিকতা জন্ম নেয়। এই প্রবণতাই অনেক সময় চাঁদাবাজি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের রূপ ধারণ করে। একটি রূঢ় বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নেতা কর্মীকে রাজপথের মিছিলে দেখতে চান, কিন্তু ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে চান না। এর পেছনে কাজ করে আধিপত্য বজায় রাখার নিগূঢ় কৌশল। কর্মীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুললে সে হয়তো আর নেতার পেছনে ‘জি হুজুর’ বলে সময় দেবে না। তাই কর্মীকে অভাবী রাখা অনেক ক্ষেত্রে নেতার প্রভাব টিকিয়ে রাখার অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।
ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর অনেক নেতার মধ্যে এক ধরনের ‘অভিজাত’ মানসিকতা তৈরি হয়, যেখানে তারা ত্যাগী কর্মীকে আর সমমর্যাদার মনে করেন না। তারা রাজনীতির ত্যাগ ও ব্যবসার মুনাফাকে আলাদাভাবে দেখেন এবং মনে করেন কর্মীকে প্রশ্রয় দিলে সে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
দলে যখন সুস্থ ধারার রাজনৈতিক চর্চা থাকে না, তখন মেধাবী ও আদর্শবান কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এই শূন্যস্থান দখল করে নেয় সুবিধাবাদী ও পেশিশক্তির কারবারিরা। দল যখন কর্মীদের জন্য কোনো গঠনমূলক কর্মসংস্থান বা সৃজনশীল কাজের সুযোগ তৈরি করে দেয় না, তখন তারা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে এবং জীবিকার প্রয়োজনে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। দলের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ করেও যখন পার পাওয়া যায়, তখন সেই প্রবণতা সংক্রামক হয়ে ওঠে। নেতা যখন দেখেন তার হয়ে ‘মাঠ গরম’ রাখা কর্মীটি চাঁদাবাজি করছে এবং তাতে তিনি নিশ্চুপ থাকেন, তখন অন্য কর্মীরাও এই পথে হাঁটতে উৎসাহিত হয়। কর্মীকে কেবল স্লোগান দেওয়ার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে কুটির শিল্প, সমবায় বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া অপরিহার্য, কর্মীদের মধ্যে নিয়মিত রাজনৈতিক শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানো। অপরাধ করলে দলীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভালো কাজের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। কর্মীকে পেটের দায়ে রাজনীতি করতে বাধ্য না করে তার জন্য সম্মানজনক উপার্জনের পথ তৈরি করে দেওয়া। কর্মী যদি কেবল পেটের দায়ে রাজনীতি করে, তবে তার বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু কর্মী যদি আদর্শের টানে রাজনীতি করে এবং তার জীবিকার একটি নিশ্চিত পথ থাকে, তবে সে কখনো দলের সম্মান ক্ষুণ্ণ করবে না। নেতাদের অনুধাবন করতে হবে—একজন শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী কর্মীই দলের সবচেয়ে বড় সম্পদ, বোঝা নয়।
"স্লোগান ও শেকল"
[এম রাসেল সরকার ]
দীর্ঘদিনের রক্ত-ঘাম আর মামলার কালো রাত, অভাবের ঘরে কান্না লুকায়ে সয়েছি আঘাত।
অন্ধকারে স্বপ্ন বুনেছি— সুদিন আসিবে বলে, দলের পতাকা উঁচিয়ে ধরেছি তপ্ত রোদের তলে।
সুদিন এল, গদিতে বসিল আপন জননেতা, কিন্তু ঘোচেনি কর্মীর মনে জমানো হাজারো ব্যথা।
নেতা চায় মোরে মিছিলে শুধু, চায় না অংশীদার, পকেটে শূন্য, পেটের দায়ে হাতে তুলি অবিচার।
নেতা ভাবে যদি স্বাবলম্বী হয় শোষিত এই হাত, তবে কেন আমি মানিব তাঁহার সকল ফরমান?
অভাবে রাখিলে দাস হয়ে রবে, ভাঙিবে না মৌনতা, আদর্শ আজ ধুলোয় মিশেছে, বেড়েছে বিলাসিতা।
দলের নামে চাঁদাবাজি চলে, বাড়ে ক্ষমতার দাপট, আসল কর্মী কোণঠাসা আজ, সামনে সুবিধালম্পট।
মেধাবীরা সব দূরে সরে যায়, মাসল-ম্যানদের ভিড়, নেতার হাসিতে ম্লান হয়ে যায় কর্মীর নতশির।
কর্মী যদি হয় আদর্শবান, জোটে না তাহার ঠাঁই, পেটের তাগিদে লড়িতে লড়িতে মূল্যবোধ হারাই।
হে নেতা শোনো, কর্মীরা নহে কেবল স্লোগান যন্ত্র, স্বনির্ভর কর্মীর হাতেই বাঁচে জয়ের মন্ত্র।
বোঝা করো না, সম্পদ করো কর্মীর প্রতিটি হাত, সম্মান দাও, ঘুচে যাক সব অশুভ অন্ধকার রাত।
জীবিকা যদি সম্মান পায়, আদর্শ থাকে অটল, তবেই তো দল শক্তিশালী, তবেই রাজনীতি সফল।
লেখক পরিচিতি:
এম রাসেল সরকার
তারিখ: ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৩ মার্চ ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
ই-মেইল: Sheikhmdraselbd@gmail.com
Leave a Reply