দুই পা হারানো সিরাজের জীবনে নতুন আশার আলো
মাইনুল ইসলাম রাজু
আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি:
“দুইডা পাও কাইট্যা হালানোর পর মুই মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা কইর্যা খাইতাম। এহন আর মোর ভিক্ষা করোন লাগবে না। মুই এহন দোহানের লাভের ট্যাহা দিয়া বউ-পোলা লইয়া খাইতে পারমু।”
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন বরগুনার আমতলী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সড়ক দুর্ঘটনায় দুই পা হারানো মো. সিরাজুল ইসলাম আকন (৫৫)। মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তার জীবন বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির উদ্যোগে সিরাজের জন্য চালু করা হয়েছে একটি ‘ভালোবাসার দোকান’।
জানা গেছে, সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ঢাকায় ভ্যানচালক হিসেবে কাজ করতেন। বিভিন্ন দোকানে মালামাল পরিবহন করে যা আয় করতেন, তা দিয়েই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চলছিল তার সংসার। ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পথে আমতলী-পটুয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের কালিবাড়ি এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। বরিশাল সেনানিবাসের একটি জীপের সঙ্গে অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন সিরাজসহ ছয়জন।
দুর্ঘটনায় সিরাজের দুই পা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন বরিশাল, ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিজের ও পৈত্রিক সব জমিজমা বিক্রি করতে হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের পরামর্শে তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়। কর্মক্ষমতা হারিয়ে একপর্যায়ে পরিবার চালাতে বাধ্য হন ভিক্ষাবৃত্তিতে।
এমন অসহায় পরিস্থিতির খবর জানতে পারেন জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের সভাপতি সাংবাদিক মো. জাকির হোসেন ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা প্রবাসী জিয়াউর রহমান। পরে তারা সিরাজের সঙ্গে কথা বলে তাকে স্বাবলম্বী করতে একটি দোকান করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমতলী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে সিরাজের বাড়ির সামনে “টি পয়েন্ট” নামে একটি ‘ভালোবাসার দোকান’ স্থাপন করা হয়। দোকানের জন্য মুদি পণ্য, মনোহরি সামগ্রী, চা-বিস্কুটসহ প্রায় ৩০ হাজার টাকার মালামাল দেওয়া হয়েছে।
রবিবার বিকেল ৪টায় ফিতা কেটে দোকানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মানজুরুল হক কাওছার।
দোকান পেয়ে খুশি সিরাজুল ইসলাম বলেন, “এহন আর মোর ভিক্ষা কইর্যা খাওন লাগবে না। দোহান দিয়া মুই ভালো থাকতি পারমু। জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন মোর জীবনের একটা গতি কইর্যা দিছে। আল্লাহ যেন হেগো আরো তৌফিক দেন মানুষরে সাহায্য করার।”
সিরাজের স্ত্রী লাকী বেগম বলেন, “মোগো দোকানডা দিয়া ফাউন্ডেশন অনেক উপকার করছে। আল্লাহ যেন হেগো ভালো রাখে।”
জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের সভাপতি সাংবাদিক জাকির হোসেন বলেন, “আমাদের বাবা-মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ভবিষ্যতেও মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মানজুরুল হক কাওছার বলেন, “জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে অসহায় মানুষ, প্রতিবন্ধী ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করে আসছে। সংগঠনটির এমন মানবিক উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।”
Leave a Reply